Home Lead মেগা প্রকল্পেও কাটেনি জলজট: চিরচেনা জলমগ্নরূপে খুলনা মহানগরী

মেগা প্রকল্পেও কাটেনি জলজট: চিরচেনা জলমগ্নরূপে খুলনা মহানগরী

33


মোস্তফা জামাল পপলু।।


জৈজষ্ঠ্যের শেষ বেলায় এক পশলা বৃষ্টি| তাতেই চিরচেনা রূপসা পাড়ের ব্যস্ত নগরী খুলনা ফিরেছে তার পুরোনো জলমগ্নরূপে| সন্ধ্যার আগে শুরু হওয়া গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পরবর্তীতে মাঝারি ধরনের বর্ষণে রূপ নিলে থমকে যায় গোটা শহর| সামান্য এই বৃষ্টিপাতেই মহানগরীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি তলিয়ে গেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে| খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) শত শত কোটি টাকার ড্রেনেজ মেগা প্রকল্প চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রতি বছর বৃষ্টি হলেই কেন এই একই ভোগান্তি, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নগরবাসী|


অলিগলি যেন একেকটি নদী, বিকল যানবাহন: সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই মহানগরীর রয়্যাল মোড়, শান্তিধাম মোড়, পিটিআই মোড়, শিববাড়ী, কেডিএ এভিনিউ, খানজাহান আলী রোড, টুটপাড়া, নিরালা ও চানমারীসহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে| সড়কগুলোতে ˆথ ˆথ পানি জমে যাওয়ায় ইজিবাইক ও রিকশা চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে| অনেক স্থানে যানবাহন বিকল হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে| আর এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গণপরিবহনগুলো কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দাবি করছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের|


টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা এক কলেজ শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা এলেই কোটি কোটি টাকার ড্রেন কাটার গল্প শুনি| কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, সামান্য এক ঘণ্টার বৃষ্টি হলেই আমাদের ঘরের দোরগোড়ায় পানি চলে আসে| এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?”


ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ড্রেনের নোংরা পানি, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি: আকস্মিক জলাবদ্ধতা শুধু জনজীবনকেই স্থবির করেনি, বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের| মহানগরীর রয়্যাল মোড়, ফুল মার্কেট ও বিভিন্ন নিচু এলাকার শত শত দোকানপাটে ড্রেনের নোংরা পানি ঢুকে পড়েছে| আকস্মিক পানি ঢুকে পড়ায় অনেক দোকানের চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ পচনশীল পণ্য এবং ফার্নিচার নষ্ট হয়ে গেছে|
শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই নয়, নিচু এলাকার আবাসিক বাড়িঘরের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে| ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঘরের ভেতর প্রবেশ করায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ|


কাগজে-কলমে শেষ মেগা প্রকল্প, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র: কেসিসির তথ্য এবং প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নয়নে ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি মেগা প্রকল্প বিগত কয়েক বছর ধরে চলমান রয়েছে| এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৫৮ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার এবং ময়ূর নদসহ গুরুত্বপূর্ণ ১২টি খালের পুনঃখনন ও সংস্কার করার কথা রয়েছে|


কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জুনে (চলতি মাসে) শেষ হওয়ার কথা রয়েছে| কেসিসির দাবি, প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে| তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা| নগরবাসীর অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হলেও সংযোগ নালাগুলো সচল না থাকায় এবং ড্রেনের বর্জ্য সময়মতো পরিষ্কার না করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না|


জলজটের নেপথ্যে তিন কারণ: নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, খুলনার এই স্থায়ী জলাবদ্ধতার পেছনে মূলত তিনটি কারণ দায়ী: ১. সমš^য়হীন উন্নয়ন: মূল সড়ক ও ড্রেন উঁচু করা হলেও সংযোগ ড্রেনগুলো নিচু ও সরু রয়ে গেছে, যার ফলে পানি মূল চ্যানেলে পৌঁছাতে পারছে না| ২. খাল দখল: মহানগরীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ময়ূর নদসহ ২২টি প্রাকৃতিক খাল এখনো পুরোপুরি অবৈধ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি| ৩. নদীর নাব্যতা সংকট: রূপসা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের ভেতরের পানি নদীতে সহজে নামতে পারছে না|


কর্তৃপক্ষের সেই চেনা আশ্বাস: তীব্র জলাবদ্ধতা ও নাগরিক ক্ষোভের বিষয়ে কেসিসির প্রকৌশল বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, ড্রেনেজ প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে| তবে কিছু এলাকায় পাম্প হাউস এবং আউটলেটগুলোর ফিনিশিং কাজ বাকি থাকায় পানি সরতে কিছুটা সময় লাগছে| তাছাড়া ড্রেনের মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকায় পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে| দ্রুত পানি নিষ্কাশনে কেসিসির বিশেষ টিম মাঠপর্যায়ে কাজ করছে|


শেষ কথা: তবে কর্তৃপক্ষের এই প্রথামুগ্ধ আশ্বাসে আর আস্থা রাখতে পারছেন না খুলনাবাসী| ˆজষ্ঠ্যের এই বৃষ্টি যে বার্তা দিয়ে গেল, তা অত্যন্ত পরিষ্কার—শুধু কোটি কোটি টাকার বাজেট বা মেগা প্রকল্প পাস করলেই হবে না, যদি না তাতে সঠিক পরিকল্পনা, সততা ও জবাবদিহিতা থাকে| ৮২৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প যেন আজ নিজেই এক বিশাল জলাবদ্ধতার বেড়াজালে বন্দী| আসন্ন বর্ষায় খুলনা মহানগরবাসীকে যে চরম জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হবে, তারই আগাম বার্তা দিয়ে গেল এই এক পশলা বৃষ্টি|