ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর গতকাল হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে এনসিপি; তবে বিএনপির পক্ষ থেকে হামলায় জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে।
ঘটনার সময় একজন অস্ত্রধারীকে দেখা যায়, তিনি শিবিরের সদস্য বলে দাবি করেছে ছাত্রদল। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, অস্ত্রধারী এনসিপির ভলান্টিয়ার টিমের সদস্য। বেলা ২টার দিকে ঝিনাইদহের পুরাতন ডিসি কোর্ট মসজিদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে এনসিপি। ইতোমধ্যে অস্ত্রধারীর একটি ভিডিও এবং একাধিক ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ১১৫ জনের নামে স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ তার সঙ্গে কথা বলতে যান। একপর্যায়ে সাহেদের পেছন দিক থেকে কয়েকজন যুবক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে এনসিপির তিনজন স্থানীয় কর্মী আহত হন। ঘটনার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নেতাকর্মীদের নিয়ে থানায় আসেন।
স্থানীয়রা জানান, হামলার ঘটনাটি ডিসির বাসভবনের সামনে হয়েছে। সুতরাং, সেখানে সরকারি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা স্বাভাবিক। তাছাড়া পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতেও সিসিটিভি থাকে। সেগুলো থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একদল তরুণ দুই বা তিনজন লোককে রাস্তার ওপর পেটাচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন কোমরে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র বের করে গুলি করতে উদ্যত হন। তখন অপরজন তাকে নিবৃত্ত করেন।
ঘটনার বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘জুমার নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। হামলায় জেলা পরিষদ প্রশাসক ও ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ এবং নব্য বিএনপি কর্মী রাশেদ খানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতৃত্বে হকিস্টিকসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার ওপর হামলা করা হয়।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে আমরা শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি। হামলার সময় আমাদের অনেক সহকর্মীর ফোন ও মানিব্যাগ ছিনতাই করে নিয়ে যায় তারা। এমনকি আমাদের ওপর ডিমও নিক্ষেপ করা হয়।’
ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর এলাকায় যদি আইনশৃঙ্খলার এমন অবনতি হয়, তাহলে আমরা মনে করি, আইনমন্ত্রী তার জায়গায় থাকতে পারেন না। আইনমন্ত্রীকে দ্রুত পদত্যাগ করিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।’ তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি এই ঘটনার বিচার না করেন, তাহলে আমরা ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও করব।’
এ ব্যাপারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিভিন্ন জেলায় সফরে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নিয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঝিনাইদহ সফরে এলে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য না দেওয়ার বিষয়ে আলাপ করতে যাই। এ সময় স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা ডিম নিক্ষেপ করে। মারামারি বা ডিম নিক্ষেপের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’
অন্যদিকে ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার রাসেল বলেন, ‘এ ঘটনায় ছাত্রদলের কেউ জড়িত নয়।’
এদিকে অস্ত্রধারীর পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ছবি ও ভিডিওতে যাকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা গেছে, তার নাম আশিক। তিনি এনসিপির ভলান্টিয়ার টিমের সদস্য। তার বাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কাষ্টসাগরা গ্রামে। ছবিতে দেখতে পাওয়া অপরজনের নাম সিয়ামউদ্দিন তূর্য। তার বাড়ি ঝিনাইদহ শহরের কোর্টপাড়ায়।
তবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দাবি করেছেন, অস্ত্রধারী দুজন এবং তারা শিবিরের সন্ত্রাসী। গতকাল বিকালে ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এই দাবি জানান। স্ট্যাটাসের সঙ্গে তিনি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গী দাবি করে দুই অস্ত্রধারীর কয়েকটি ছবিও পোস্ট করেছেন।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছিরের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো- ‘গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত, সমালোচিত, মব ও সংঘাত উসকে দেওয়া ব্যক্তি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
আজও ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন মব করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে সাধারণ জনতা আজ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ডিম নিক্ষেপ করে। এ সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলি করার চেষ্টা করে।
অস্ত্রধারী এ দুজন শিবিরের সন্ত্রাসী। তাদের পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:
১. সিয়ামউদ্দিন তূর্য (পাঞ্জাবি পরিহিত): পিতা জামায়াতের নেতা সল্টু মাস্টার (শিক্ষক, বদরগঞ্জ মাদ্রাসা)। ঠিকানা: মাস্টারপাড়া, কোর্টপাড়া, ঝিনাইদহ।
২. আশিক (টি-শার্ট পরিহিত): পিতা মৃত বাদশা, গ্রাম: কাষ্টসাগরা। তিনি শিবিরের নেতা।
অনতিবিলম্বে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে অস্ত্রধারী এই দুজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করার জন্য জোর অনুরোধ রইলো।’
এদিকে ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদউজ্জামান গতকাল বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী থানায় এসেছেন। এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ পাইনি।’









































