মিলি রহমান।।
কাজের ফাঁকে, গভীর রাতে, হঠাৎ অলস দুপুরে কিংবা বিকেলের নাস্তায়—মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে। কিছু একটা খেতে ইচ্ছে করে খুব।
কখনও চকোলেট, কখনও চিপস, আবার কখনও ডুবো তেলে নানাপদের ভাজাপোড়া। অনেকেই এটিকে শুধুই লোভ, বদভ্যাস বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব বলে মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
ভারতীয় গণমাধ্যম এই সময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন লোভনীয় অভ্যাস অনেক সময় শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঘাটতি, মানসিক চাপ বা শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ কোনো নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছাকে বলা হয় ‘ফুড ক্রেভিং’। এটি এক ধরনের সংকেত। কারণ খাবারের এমন তীব্র ইচ্ছা শরীরের ঘাটতির কথা জানিয়ে দেয়। অর্থাৎ শরীর যখন সরাসরি কথা বলতে পারে না, তখন মস্তিষ্ক খাবারের প্রতি আকর্ষণের মাধ্যমে সংকেত পাঠায়।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শরীরে পানির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা রক্তে শর্করার ওঠানামা—এসব কারনেই তৈরি হতে পারে অস্বাভাবিক খাবারের আকাঙ্ক্ষা।
মিষ্টি বা চকোলেটের ইচ্ছে যে বার্তা দেয়
যদি হঠাৎ করে খুব ইচ্ছে হয় চকোলেট, কেক, পেস্ট্রি বা মিষ্টি খেতেই হবে। এই প্রবল ইচ্ছা রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে মস্তিষ্ক দ্রুত শক্তির খোঁজ করে। আর চিনি খুব দ্রুত শরীরে শক্তি জোগাতে পারে বলেই তখন মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা ক্লান্তির সময়ও শরীর এমন খাবার চায়, যা মুহূর্তেই এনার্জি দিতে পারে। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা থাকলে সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ এটি ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা হরমোনজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নোনতা খাবারে ঝোঁক কেন
ভাজাপোড়া খাবারে থাকে বাড়তি লবণ। বিকেলের নাস্তায় এই ভাজাপোড়া না হলে অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসে। অনেকের অকারণেই চিপস বা অতিরিক্ত নোনতা খাবারের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম, গরমে দীর্ঘ সময় থাকা বা পর্যাপ্ত পানি না খেলে শরীর লবণের ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। তখন মস্তিষ্ক নোনতা খাবারের সংকেত পাঠায়। একই সঙ্গে মানসিক অবসাদ বা অতিরিক্ত ক্লান্তিও নোনতা খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে পারে।
ভাত-রুটি খাওয়ার ইচ্ছে
হঠাৎ করে ভাত, রুটি, নুডলস, পাস্তা বা টোস্ট খেতে খুব ইচ্ছে করা মানে শরীর দ্রুত শক্তি পেতে চাইছে। কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগানোর পাশাপাশি মানসিক স্বস্তিও দেয়। তাই উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা অতিরিক্ত ব্যস্ততার সময় অনেকেই অবচেতনভাবে এসব খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অনেক সময় মানসিক চাপেরও প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
বরফকুচি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা
কিছু মানুষের মধ্যে অদ্ভুত জিনিস খাওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। যেমন—বরফ চিবিয়ে খাওয়া, মাটি, সিমেন্ট বা চক খেতে ইচ্ছে করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘পিকু’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শরীরে আয়রনের তীব্র ঘাটতি বা অ্যানিমিয়ার লক্ষণ হতে পারে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, এমন উপসর্গ দেখা দিলে তা কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কখন সতর্ক হবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝে মধ্যে কোনো খাবার খেতে ইচ্ছে করাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি একই ধরনের খাবারের প্রতি অস্বাভাবিক ও ঘন ঘন আকর্ষণ তৈরি হয়, তাহলে সেটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
তাই শুধু খাওয়ার ইচ্ছাকে ‘লোভ’ ভেবে উড়িয়ে না দিয়ে, শরীরের সংকেত হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পানি পান, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলে অনেক ক্ষেত্রেই ফুড ক্রেভিং কমে আসে।









































