যশোর অফিস।।
যশোরের ভাতুড়িয়ায় মুক্তেশ্বরী নদী উদ্ধার অভিযান এখন আদালতের নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে। নদী দখলকারীদের আইনি লড়াইয়ে থমকে আছে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া, আর সেই স্থবিরতায় বাড়ছে স্থানীয়দের উদ্বেগ। অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রপক্ষের দুর্বল অবস্থানের কারণেই জটিল হয়েছে দখলমুক্তের উদ্যোগ। ফলে বর্ষা সামনে রেখে আবারও জলাবদ্ধতার আতঙ্কে বিল হরিণার হাজারো মানুষ। চাষের বাইরে থেকে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে প্রায় চার হাজার বিঘা জমিও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে দখলের মাধ্যমে যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া ও ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত মুক্তেশ্বরী নদীর পুরো অংশই ভরাট করেছে একটি চক্র। পরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেই ভরাট করা জায়গায় প্লট কেটে বিক্রির নোটিশ টাঙানো হলে বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নদী উদ্ধারের দাবিতে স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদারের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে মুক্তেশ্বরী নদী দখলের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে।
মুক্তেশ্বরী নদীর ভাতুড়িয়া মৌজার অংশ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়- সিএস রেকর্ডে চাঁচড়া জমিদার রাজা বরদাকান্ত রায়ের নামে ১৯৭৮ ও ১৯৮০ নম্বর দাগে ৩৮১ শতক জমি ‘খাল’ শ্রেণি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা মুক্তেশ্বরী নদীর অংশ হিসেবে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। পরবর্তীতে এসএ রেকর্ডেও একই জমি রাজা বরদাকান্ত রায়ের ওয়ারিশদের নামে ‘খাল’ শ্রেণিতেই বহাল থাকে। তবে পরবর্তী আরএস মাঠ জরিপে কমিটি সরকারের পক্ষে যশোরের কালেক্টরের নামে ৩৪০ শতক ‘খাল’ ও ‘ধানী’ শ্রেণি হিসেবে রেকর্ড করা হয়। এরপর আরএস রেকর্ডে ওই ৩৮১ শতক জমি মোস্তফা কামাল উদ্দিন, মোস্তফা জালাল উদ্দিন ও মোস্তফা আওয়াল উদ্দীনের নামে ‘পুকুর’ ও ‘ধানী’ জমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।’
অর্থাৎ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তেশ্বরীর এই অংশ সরকারি হলেও অনিয়মের মাধ্যমে তা ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়েছে।
এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গত ২৯ অক্টোবর নদী রক্ষা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত হয়- পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুততার সঙ্গে উক্ত ভরাটকৃত অংশ পুনঃখননের ব্যবস্থা করবেন এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ সহায়তা করবে।
এদিকে নদী রক্ষা কমিটির এই সিদ্ধান্তের পর পদক্ষেপ গ্রহণের বিলম্বের সুযোগে গত ১ ডিসেম্বর যশোর সদর সিভিল জজ আদালতের দ্বারস্থ হন জমির রেকর্ডধারী মোস্তফা জামাল উদ্দিন। এই মামলার রায়ে গত ১০ মে আদালত নদীর দখল উচ্ছেদে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নদী দখলচিত্রের কাগজপত্র এবং জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথভাবে উপস্থাপন করেননি। কারণ জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে নদী দখল ও ভরাট করার চিত্র পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনসহ অনেক কাগজপত্রই আদালতে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তারপরও সংশ্লিষ্ট তহশিলদার বিষয়বস্তু আদালতে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তবে তারপরও আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্ট আদালতের জিপি অ্যাড. মোহাইমেন দাবি করেন, আদালতে যথাযথ ভূমিকা রেখেছেন। যারা বাদী তারা ক্রয়সূত্র মালিকানা পেয়েছেন। ওই জমি নিয়ে ৮৩ সালে মামলা হয়। সেই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হেরে যায় এবং জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। পরবর্তীতে আপিল হলেও তা খারিজ হয়ে যায়। আদালত ওই রায়কে গুরুত্ব দিয়ে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
ওই জমির কেয়ারটেকার যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের এক সময়ের পিয়ন নূর ইসলাম নুরু বলেন, সেই জমির মালিক মোস্তফা জালাল উদ্দিন আদালতে মামলা করেছেন। তারা জমিটি ক্রয়সূত্রে পেয়েছেন। আদালত জমির কাগজপত্র আমলে নিয়ে ওই জমিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।
এদিকে আদালতের এই আদেশের কারণে বিল হরিণা অঞ্চলের হাজারো কৃষকের ভাগ্য আবারও সেই অন্ধকারেই থেকে যায়। গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার পরিধি আরও বেড়েছে। নদীর দখল উচ্ছেদ না হলেও আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকার প্রায় চার হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে থাকবে। ফলে এই জমির ফসল বঞ্চনার পাশাপাশি ওই এলাকার বাড়িঘরেও পানি ঢুকে পড়ার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয়রা।
ভাতুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদুর রহমান জানান, হরিণার বিলপাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মুক্তেশ্বরীর এই প্লট অপসারণের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। প্রশাসনের তদন্তে জালিয়াতি করে জমির রেকর্ড ও দখলের সত্যতা উঠে আসায় এবং দখল উচ্ছেদের সিদ্ধান্তে তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। তাদের আশা ছিল, দ্রুত নদী খনন করা হলে বিলের পানি নেমে যাবে। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচে দিনে দিনে অবস্থা আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে।
একই এলাকার বাসিন্দা তৌহিদুর রহমান জানান, জমি জালিয়াত চক্রটিকে আদালতের মাধ্যমে সময় ক্ষেপণর চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে তারা দখল বজায় রাখতে চান। এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে এবং তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন।
বিল হরিণা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শেখ রাকিবুল ইসলাম নয়ন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে একসময়ের তিন ফসলি হাজার হাজার বিঘা জমি এখন বছরে মাত্র একটি ফসল দিচ্ছে। নদী দখল উচ্ছেদ করা গেলে আবারও কৃষকের মুখে হাসি ফুটতো। কিন্তু এখন তা দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, মুক্তেশ্বরী নদী দখলের কারণে বিল হরিণার কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড দেখভাল করছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, তদন্ত করে নদী দখলের সত্যতা পাওয়া গেছে। নদীর জমি কোনোভাবেই ব্যক্তি মালিকানায় যাওয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান। তাই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
মুক্তেশ্বরী দখলের প্রতিবেদন এবং আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার জানান, মুক্তেশ্বরীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে দ্রুতই ওই রায়ের ব্যাপারে জেলা জজ আদালতে আপিল করবেন।











































