অনলাইন ডেস্ক।।
পরিবারের বড় ছেলেকে গাজার হাসপাতাল, মর্গ, ধ্বংসস্তূপ—কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মৃত্যুসনদ পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৮ মাস ধরে তার পরিবারের ধারণা ছিল তিনি বেঁচে নেই। শোক পালনের জন্য বাড়ির সামনে টানানো হয়েছিল তাঁবুও।
কিন্তু সেই তরুণের সন্ধ্যান মিলেছে। তিনি জীবিত আছেন। রয়েছেন ইসরায়েলের কারাগারে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার রাফাহ শহরের এক পরিবারের সন্তান তিনি। তার নাম নায়েল আবু শার। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের বেঁচে থাকার এই খবর প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়েছে, হঠাৎ একদিন এক আইনজীবীর ফোনে বদলে যায় সবকিছু। জানা যায়, ২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণ ঈদ নায়েল আবু শার জীবিত আছেন এবং তাকে ইসরায়েলের ওফার কারাগারে আটক রাখা হয়েছে।
গাজার হাজারো পরিবারের মতো আবু শার পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। তাদের ছেলে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন, অজ্ঞাত গণকবরে দাফন হয়েছে, নাকি ইসরায়েলের কারাগারে আটক আছেন- তা জানতেন না তারা।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন ঈদ আবু শার। পরিবারকে সহায়তার জন্য কাজ খুঁজতে তিনি গাজার মধ্যাঞ্চলের নেতজারিম করিডরের কাছে গিয়েছিলেন। এলাকাটি ‘অ্যাক্সিস অব ডেথ’ বা মৃত্যুফাঁদ নামেও পরিচিত। যুদ্ধের সময় সেখানে বহু ফিলিস্তিনি নিহত বা নিখোঁজ হন।
ঈদের বাবা নায়েল আবু শার বলেন, ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে তার পরিবার প্রায় ভেঙে পড়েছিল। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি হাসপাতাল আর মর্গের দুয়ারে দুয়ারে ঘুমিয়েছি। কোথাও অজ্ঞাতপরিচয় কোনো মরদেহের খবর পেলেই ছুটে যেতাম। নিজ হাতে মর্গের ফ্রিজ খুলে তার কাপড় বা কোনো চিহ্ন খুঁজেছি। কিন্তু কিছুই পাইনি।’
রেডক্রস ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের দ্বারে দ্বারেও সহায়তার জন্য ঘুরেছেন বাবা। কিন্তু কোথাও তার আটকের তথ্য পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত তারা ধরে নেন, ছেলে মারা গেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেও তাকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। তবে ছেলের মা মাহা আবু শার কখনো বিশ্বাস হারাননি। তিনি বলেন, ‘সবাই বলছিল, গায়েবানা জানাজা পড়তে হবে। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমার মন বলছিল, ছেলে বেঁচে আছে।’
ছেলের মা মাহা আবু শার বলেন, ‘আমি খুশি। কিন্তু এখন আরও বেশি ভয় হচ্ছে। জানি সে বেঁচে আছে। কিন্তু ওই কারাগারে কী যন্ত্রণা সহ্য করছে, সেটাই ভাবছি। তাকে আবার বুকে জড়িয়ে না ধরা পর্যন্ত আমি পুরোপুরি শান্তি পাব না।’
প্রায় এক মাস আগে ওফার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া এক বন্দী জানান, কারাগারে তিনি ঈদ আবু শার নামের একজনকে দেখেছেন। এরপর গত সোমবার এক আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই গাজায় আবু শার পরিবারের বাড়িতে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। যে বাড়ি এত দিন শোকের সাগরে ডুবে ছিল, সেটি যেন মুহূর্তে উৎসবে ভরে ওঠে।
তবে ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও গুমবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক নাদা নাবিল বলেন, এই ঘটনা ব্যতিক্রম হলেও গাজায় এখনো হাজারো পরিবার একই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধে বর্তমানে সাত থেকে আট হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত দেড় হাজার ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলের কারাগারগুলোতে গুম করে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাবিলের অভিযোগ, ইসরায়েল সচেতনভাবে আটক ব্যক্তিদের তথ্য গোপন রাখে। এতে পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করা বা রেডক্রসকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন রাখা হয়, যা মানসিক নির্যাতন ও সমষ্টিগত শাস্তির অংশ।











































