রহমান মিজান।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগে নজিরবিহীন ফলাফল দেখা গেছে। বিভাগের ১০ জেলার ৩৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, আর মাত্র ১১টি আসনে সীমিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। খুলনা বিভাগে আগে কখনো এত বিপুল আসনে জামায়াতের জয় দেখা যায়নি। সারা দেশে জামায়াত যে ৬৮টি আসন পেয়েছে, তার প্রায় ৩৭ শতাংশই এসেছে এই বিভাগ থেকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়-বরং খুলনা অঞ্চলে সাংগঠনিক শক্তি, প্রার্থী বাছাই, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও জনমতের পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রতিফলন।
ফলাফল অনুযায়ী- বিএনপি: খুলনায় ৪টি, মাগুরায় ২টি এবং বাগেরহাট, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় ১টি করে আসনে জয়। জামায়াত: যশোরে ৫টি; সাতক্ষীরায় ৪টি; বাগেরহাট, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় ৩টি করে; খুলনা, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে ২টি করে এবং নড়াইলে ১টি আসনে জয়। মাগুরা ছাড়া সব জেলাতেই আসন পেয়েছে জামায়াত। সাতক্ষীরার চারটি আসনই গেছে তাদের ঝুলিতে। যশোরে প্রথমবারের মতো পাঁচটি আসনে এককভাবে জয় পেয়েছে দলটি। তবে চমক থাকলেও ব্যতিক্রমও আছে-খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পরাজিত হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর আসনে প্রায় ছয় হাজার ভোট বাতিল হয়েছে এবং বিষয়টি পুনঃপরীক্ষার আবেদন বিবেচনায় রয়েছে।
বিএনপির ভরাডুবি: কোথায় ভুল?
খুলনা বিভাগে বিএনপির এই ফলকে অনেকেই “রাজনৈতিক বিপর্যয়” বলছেন। দলটির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ থেকে বিজয়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্বীকার করেছেন, প্রার্থী পরিবর্তন, মনোনয়নবঞ্চিতদের সক্রিয় না করতে পারা এবং ধর্মীয় প্রচারের কৌশল মোকাবিলায় ব্যর্থতা-এসব কারণ সামনে এসেছে। তিনি বলেন, দল ডাটা বিশ্লেষণ করছে এবং চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরে জানানো হবে। তবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আরও কঠোর ভাষায় বলছেন- শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদল করে মাঠের কর্মীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে। কিছু এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে। যশোর জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে-এ কথাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
জামায়াতের উত্থান: সংগঠন ও কৌশলের সমন্বয়:
সুজন খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা মনে করেন, জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিমত্তা, নারী কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তৃণমূলভিত্তিক প্রচারণা বড় ভূমিকা রেখেছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিশেষ মনোভাব ও সামাজিক ইস্যুও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য শফিকুল আলম বলেন, “আমরা মানুষের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। বিপদে পাশে থেকেছি। মানুষ তার প্রতিদান দিয়েছে।” খুলনা-২ আসনে নগর এলাকায় প্রথমবারের মতো জামায়াতের জয় বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা। সেখানে হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পরাজয় দলীয় মহলে অতি আত্মবিশ্বাস ও সমন্বয়হীনতার ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটের পরিসংখ্যান:
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, বিভাগের ৩৬টি আসনে মোট ভোটার ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৮৮ জন। ভোটকেন্দ্র ছিল ৫,১৩৩টি। জেলাভিত্তিক ভোট পড়ার হার- খুলনা ও বাগেরহাটে প্রায় ৬৬%, নড়াইলে ৬৫%, মাগুরায় ৭০%, যশোরে ৭২%, ঝিনাইদহে ৭১%, চুয়াডাঙ্গায় ৭৬%, কুষ্টিয়ায় ৬৭%, মেহেরপুরে ৭৩%।
খুলনা বিভাগে প্রায় ৭০ শতাংশ আসনে জয় এনে জামায়াত নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির সামনে এখন আত্মসমালোচনা ও হারানো জমিন ফিরে পাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই ফলাফল প্রমাণ করেছে-দলীয় ঐতিহ্য নয়, সংগঠন ও মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতাই শেষ কথা বলে। খুলনা বিভাগের ভোটাররা এবার যে বার্তা দিয়েছেন, তা উপেক্ষা করার সুযোগ কোনো দলেরই নেই।










































