Home খেলাধুলা বিপর্যস্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, লাভের মুখ দেখবে শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ

বিপর্যস্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, লাভের মুখ দেখবে শুধু ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ

6


স্পোর্টস ডেস্ক।।
এটি ক্রিকেটের, এমনকি সম্ভবত বিশ্ব ক্রীড়ারও সবচেয়ে মূল্যবান আন্তর্জাতিক ম্যাচ। অথচ ১৫ ফেব্রুয়ারি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তানের বহুল আলোচিত ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে না। পাকিস্তান ম্যাচটি পরিত্যাগ করায় প্রথম রাউন্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এই লড়াইটি শূন্যতায় পরিণত হয়েছে। ফলে সম্প্রচারকারীদের চার ঘণ্টার ফাঁকা সময় ভরাট করতে হবে অন্য কনটেন্ট দিয়ে।

এই বিশৃঙ্খলা আসলে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যে বড় সংকটের মুখোমুখি, তারই ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। অন্যান্য খেলাধুলার মতো ক্রিকেটও বরাবরই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলন। কিন্তু এখন সেই টানাপোড়েন এতটাই তীব্র যে ম্যাচই আর মাঠে গড়াচ্ছে না।

অন্তত পাকিস্তান এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলছে-এটাই বড় কথা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির পর আইসিসি তাদের ম্যাচ শ্রীলংকায় সরাতে অস্বীকৃতি জানালে বাংলাদেশ পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই সরে দাঁড়ায়। ফলে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে ডাকা হয়।

পাকিস্তানের সব ম্যাচ-এমনকি তারা ফাইনালে উঠলেও শ্রীলংকায় আয়োজনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এটি গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের সব ম্যাচ পাকিস্তানের বদলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়োজনের নজির অনুসরণ করেই করা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই বিশৃঙ্খলাই যেন এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

আইসিসির বহু সীমাবদ্ধতা থাকলেও এতদিন তাদের বড় শক্তি হিসেবে ধরা হতো সফলভাবে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের সক্ষমতাকে। কিন্তু টানা দ্বিতীয় পুরুষদের টুর্নামেন্ট যখন প্রহসনে শুরু হচ্ছে, তখন সেই মূল্যায়ন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে আইসিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আইসিসি টুর্নামেন্ট গড়ে ওঠে ক্রীড়াসুলভ সততা, প্রতিযোগিতা, ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতার ওপর; নির্বাচিত অংশগ্রহণ এই টুর্নামেন্টগুলোর চেতনা ও পবিত্রতা নষ্ট করে”-শুনতে কথাগুলো যেন অরওয়েলীয় ব্যঙ্গের মতো।

প্রাচীন রোমের ‘রুটি ও সার্কাস’ থেকে শুরু করে রাজনীতি বরাবরই খেলাধুলায় হস্তক্ষেপ করেছে। তবে আজকের মতো অনিবার্য সম্পর্ক খুব কমই দেখা গেছে। কাতারে সর্বশেষ ফুটবল বিশ্বকাপ, পরবর্তীটি যুক্তরাষ্ট্রে-যেখানে সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফার প্রথম ‘পিস প্রাইজ’ পেয়েছেন-আর ২০৩৪ সালের আসর সৌদি আরবে। তবু ফুটবলকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বর্তমান সংকটের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।

সম্প্রচার চুক্তির ওপর আইসিসির নির্ভরতা

ম্যাচ সূচি বদলানো হবে কি না, কিংবা আদৌ ম্যাচ হবে কি না-এমন অনিশ্চয়তা এখন নিত্যদিনের বিষয়। এবার তো ক্রিকেটের সবচেয়ে লাভজনক ম্যাচই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হবে না, যদি না পাকিস্তান শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলায়।

এর প্রভাব বিশ্ব ক্রিকেটে ভয়াবহ হতে পারে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ এতটাই মূল্যবান যে-আন্তর্জাতিক খেলাধুলায় যা অনন্য এবং আইসিসির ঘোষিত ‘ক্রীড়াসুলভ সততা’র পরিপন্থী-ড্র এমনভাবে করা হয় যেন দুই দল মুখোমুখি হয়ই।

এটি টানা ১২তম পুরুষদের বৈশ্বিক আসর যেখানে ভারত ও পাকিস্তান একই গ্রুপে। অন্য খেলায় স্বচ্ছ ড্র লাইভে দেখা গেলেও ক্রিকেটে গ্রুপিং অনেকটা দরকষাকষির মতো: আগে ভারত-পাকিস্তানকে একসঙ্গে রাখো, তারপর বাকিটা সাজাও।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের নিশ্চয়তা আইসিসির সম্প্রচার চুক্তির মূল শর্ত। জিওস্টার ২০২৪-২৭ চক্রে ভারতের সম্প্রচার স্বত্বের জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে-যা আইসিসির মোট আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ। ভেতরের তথ্য বলছে, আইসিসির মোট সম্প্রচার আয়ের (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার) প্রায় ১০ শতাংশই প্রতিটি টুর্নামেন্টে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল। এবারের ম্যাচটি না হলে সম্প্রচারকারীরা কি ছাড় চাইবে? তা না হলেও ভবিষ্যতে এত বড় অঙ্ক খরচের আগ্রহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

এমন সময় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আগেই বড় আর্থিক সংকোচনের আশঙ্কায় রয়েছে। ভারতের দুই বড় সম্প্রচারক জিও ও স্টারের একীভূতকরণ ২০২৮-৩১ চক্রের আইসিসি স্বত্বে প্রতিযোগিতা কমাবে, ফলে স্বত্বের মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

‘বিগ থ্রি’ টিকবে, বাকিরা বিপদে

নেদারল্যান্ডস ক্রিকেটের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালে মিডিয়া চুক্তি নবায়নের সময় আইসিসির আয় ৩০ শতাংশ কমতে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন কাটছাঁট আরও বড় হতে পারে-চার বছরে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারতের জন্য আইসিসির অর্থ মোট আয়ের মাত্র ১০ শতাংশের মতো, তাই তারা বড় ধাক্কা সামলাতে পারবে। কিন্তু ‘বিগ থ্রি’র বাইরে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি মারাত্মক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আয় ৪৪ শতাংশ, নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশের ৫২ শতাংশ, শ্রীলংকার ৬৮ শতাংশই আসে আইসিসি থেকে। সহযোগী ৯৬ দেশের অনেকেরই প্রায় ৯০ শতাংশ আয় নির্ভর করে আইসিসির ওপর।

অর্থ কমলে খেলোয়াড়দের বেতন দেওয়া কঠিন হবে, অবকাঠামো ও ঘরোয়া ক্রিকেটে বিনিয়োগ কমবে, টেস্ট ম্যাচ আয়োজনও হ্রাস পাবে। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা-বর্তমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন-গত গ্রীষ্মে ঘরের মাঠে একটি টেস্টও খেলেনি।

এই বাস্তবতায় দেশগুলো বিকল্প আয়ের পথে হাঁটছে। ইংল্যান্ডের ‘দ্য হান্ড্রেড’ লিগ গড়ার অন্যতম কারণ ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ওপর নির্ভরতা কমানো। নেপাল প্রিমিয়ার লিগ ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সফল, আর আয়ারল্যান্ড-নেদারল্যান্ডস-স্কটল্যান্ডকে নিয়ে ইউরোপিয়ান টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগ চালুর প্রস্তুতি চলছে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যত বিশৃঙ্খলা বাড়বে, ততই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট সম্প্রচারকারীদের কাছে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরবে। শেষ পর্যন্ত এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসল বিজয়ী হয়তো কোনো জাতীয় দল নয়-বরং বিশ্বজুড়ে ছোট ফরম্যাটের ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের মালিকরাই।