ঢাকা অফিস।।
পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম পরিবর্তনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাহিনীটির নতুন নাম রাখা হচ্ছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ (এসআইএফ)। সরকার বলছে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে বাহিনীটিকে আরও জবাবদিহিমূলক ও আইনসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হবে।
প্রেক্ষাপট ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
২০০৪ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব গঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এই বাহিনীর নাম ‘র্যাপিড অ্যাকশন টিম’ (র্যাট) প্রস্তাব করা হলেও পরে তা পরিবর্তন করে র্যাব রাখা হয়। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য অভিযোগ উঠতে থাকে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে র্যাব এবং এর সাবেক মহাপরিচালকসহ সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দফতর পৃথকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে।
পরবর্তীতে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর যে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) দীর্ঘদিন ধরেই এই বাহিনী বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুম সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও র্যাব বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সবশেষ, পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং একটি জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে র্যাবের অতীত কার্যক্রম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে এই বাহিনীটির প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মূলত এই প্রেক্ষাপটেই সংস্কারের অংশ হিসেবে নাম ও কাঠামো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলো সরকার।
বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের সংশয়
বাহিনীটির নাম ও পোশাক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে কতটা গুণগত পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “নাম বা পোশাক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে র্যাবের কর্মকাণ্ড পরিবর্তনের বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমরা একটি প্রথা দেখছি যে কোন অঘটন ঘটলে নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। যেমনটি হয়েছে বিজিবি ও পুলিশের ক্ষেত্রে। আর এখন পরিবর্তন হচ্ছে র্যাবেরও নাম। যদিও প্রতিষ্ঠার পর আরও একবার বাহিনীটির নাম পরিবর্তন হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “গুম কমিশনে থাকাকালে আমরা র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিলাম। শুধু নাম বা পোশাক বদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস মোছা সম্ভব নয়। পুলিশের চৌকস সদস্যদের নিয়ে একটি পৃথক ইউনিট করা প্রয়োজন, যেখানে অন্য কোনও বাহিনীর সদস্য থাকবে না।”
র্যাবের ভেতর সেনাবাহিনী যুক্ত হয়ে তাদের মিশ্রণে যে ঘটনাগুলি ঘটেছে, তা কল্পনাতীত বলেও জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা অনেক বড় ধরনের ভাইয়োলেশনে র্যাবের সংশ্লিষ্টতা দেখেছি। পুলিশকেও দেখেছি। কিন্তু পুলিশের ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়া বা কথা বলার সুযোগ ছিল। কিন্তু র্যাবের ব্যাপারে এই সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।”
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “নাম পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু নতুন নামে এসে পুরোনো কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। মানুষকে কার্যক্রমের পরিবর্তন দেখাতে হবে। নতুন আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে এসআইএফ-এর বড় চ্যালেঞ্জ।”
দেশের নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাবের ভূমিকা অপরিসীম উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, “র্যাব শুরুর দিকে দেশের নানা সংকটের খুব ভালো কাজ করে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। তবে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে কোনও কোনও পরিবার বা ব্যক্তির কাছে র্যাব একটি ভয়ের নামও।”
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপিও দীর্ঘদিন ধরে র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদ গত ডিসেম্বরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সংস্কারের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন গ্যাংগ্রিন হলে কেটে ফেলতে হয়, তেমনি এই বাহিনী বিলুপ্তি ছাড়া উপায় নেই।”
অন্যদিকে র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা তিনি জানলেও এখনও আনুষ্ঠানিক আদেশ পাননি। আদেশ পেলে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











































