খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
লুৎফর রহমান ও তার স্ত্রী আসমা ১০ বছর ধরে বাস করেন রাজধানীর কড়াইল বস্তির একটি ঘরে। তাদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। লুৎফর রিকশা চালান আর আসমা কাজ করেন গার্মেন্টসে। দুইজনের আয়ে এমনিতেই টানাটানিতে চলে তাদের জীবন। এর মধ্যে মঙ্গলবার বিকেলের আগুনে তাদের ঘরবাড়ি সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কি করবেন দিশা পাচ্ছেন না। এমনকি রাতে থাকবেন কই, তাও জানেন না। এমন হৃদয়বিদারক গল্প কেবল লুৎফর দম্পতির নয়, কড়াইল বস্তিবাসীর অনেকের গল্প এটি।
মঙ্গলবার রাতে কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্বর্বশান্ত হয়েছেন বাসিন্দারা।
লুৎফর রহমান জানান, বিকেলে আগুন লাগার সময় তিনি গুলশানে রিকশা চালাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই সেখানে শুনতে পান কড়াইল বস্তির বৌবাজারে আগুন লেগেছে। এ সময় তিনি দ্রুত বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তা বন্ধ করায় আর যেতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘সঙ্গে মোবাইল নেই। আগুন লাগার পরে আর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়নি। আরেকজনের মোবাইলে কল দিয়েছি কিন্তু মোবাইল বন্ধ। ঘরের জিনিসপত্র সব পুড়ে শেষ। এখানে দাঁড়িয়ে আছি স্ত্রী-সন্তান এদিকে আসলে খুঁজে বের করবো।’
রাব্বি কাজ করেন সিটি করপোরেশনে সড়ক মেরামতের। তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনসহ কড়াইল বস্তির নৌকাঘাটে থাকেন। আগুন লাগার সময় তিনি ছিলেন মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ এলাকায়। তার স্ত্রীও ছিলেন গার্মেন্টসে। কেউ ঘরে ছিলেন না। কিন্তু আগুনের খবরে বস্তিতে এসে দেখেন তাদের ঘর পুড়ে ছাই। জমানো ২০ হাজার টাকা ছিল, সেটাও পুড়ে গেছে।
রাব্বি বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থেকে এসে স্ত্রীর দেখা পেলেও ঘরের কিছুই পাইনি। আগুনে আমার সব শ্যাষ। এই শীতের রাতে থাকমু কই।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বস্তিবাসীর আহাজারিতে আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠেছে। এখনও কোনো হতাহতের খবর না এলেও আগুনে পোড়া অংশের প্রায় সবাই ‘সবকিছু’ পুড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।
বস্তির বাসিন্দা সুমন আহম্মেদ বলেন, ‘আগুনের সময় বাসার বাইরে ছিলাম। আগুনের খবর শুইনা দৌড়াইয়া আইসা দেখি সব শেষ।’
স্ত্রী ও দুই সন্তান নিরাপদে বাসা থেকে বের হতে পারলেও কিছুই সঙ্গে নিয়ে বের হতে পারেননি বলে জানান তিনি।
ফজলু নামে আরেকজন বলেন, আগুনে ৫ শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। আগুন লাগা অংশে ‘কিছুই অবশিষ্ট নেই’।
বস্তির যেসব ঘরে এখনও আগুন লাগেনি কিন্তু আগুন লাগার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব ঘর থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। কেউ মাথায় করে কেউ হাতে করে তাদের জিনিসপত্র বের করছেন।
আগুনে ঘর পুড়েছে বস্তির বাসিন্দা লাভলী বেগমের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার সব আগুনে পুড়ে শেষ। সাত বছর ধরে এই বস্তিতে আছি। অনেক কষ্টে তিল তিল করে জিনিসপত্র কিনেছিলাম। ঘরে টিভি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কিনেছি। মাসে মাসে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়। এ আগুনে আমার সব শেষ হয়ে গেল।’
‘অন্ধকারে কড়াইল বস্তি’: এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিদ্যুৎহীন রয়েছে কড়াইল বস্তি এলাকা। মোবাইল ফোনের আলো ও টর্চ লাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয়রা। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন বাসিন্দাকে দেখা গেছে, যে যার যতটুকু মালামাল রক্ষা করতে পেরেছেন, অন্ধকার সড়ক ধরে তা নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
আগুনের কারণে ওয়ারল্যাস মোড়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও।
দেখা গেছে, কড়াইল ঝিলে পাম্প বসিয়ে পাইপ দিয়ে পানি ছিটাচ্ছেন ফায়ার ফাইটাররা। পানি সরবরাহ করছে ওয়াসার গাড়িও।
উল্লেখ্য, এদিকে পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে রাজধানীর মহাখালী এলাকার কড়াইল বস্তির ভয়াবহ আগুন। তবে পুরোপুরি নিভতে আরো সময় লাগবে। মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার। এর আগে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার কথা জানানো হয়।
রাত ১০টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, আগুনের শিখার তীব্রতা কমেছে এবং বেশ কয়েকটি অংশে আগুন সীমিত করা সম্ভব হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, শুরুতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে রওনা করা ইউনিটগুলো পৌঁছাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট লাগে। সরু রাস্তা, যানজট ও মানুষের ভিড়ের কারণে বড় গাড়িগুলো আগুনের কাছে পৌঁছাতে সময় নেয়। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড়ের মধ্যে কিছু উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণেও আগুন নেভানোর কাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
পাইপ কেটে ফেলা, জোড়া খুলে দেওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, পানির ঘাটতি নেই, কিন্তু আগুনের কেন্দ্রে পানি পৌঁছাতে সময় লাগছে। এলাকা বড় হওয়ায় পাইপ জোড়া দিতে হয়েছে বহু জায়গায়।









































