Home আঞ্চলিক খুলনার অধিকাংশ নদী ও খালের এখন অস্তিত্ব নেই

খুলনার অধিকাংশ নদী ও খালের এখন অস্তিত্ব নেই

9


স্টাফ রিপোর্টার
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার অধিকাংশ নদী ও খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় এসব জলাশয়ে নৌকা চলাচল ও মাছ ধরা ছিলো সাধারণ চিত্র, আর এখন অধিকাংশ খালই কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত ভরাটের কারণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবেশের চরম বিপর্যয় ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব খাল ও নদীর কোনো সংস্কার বা খননের উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বটিয়াঘাটায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে প্রায় ৮০টিরও বেশি খাল ও জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি খালের ইজারা দেওয়া হয়, বাকি রেকর্ডীয় খাল ও জলাশয়গুলো নানা উপায়ে দখল হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। অনেক খালে অবৈধভাবে প্লট তৈরির নামে ভরাট চলছে, কোথাও আবার খালের ওপর রাস্তা নির্মাণ করে দখলদারিত্ব বিস্তার করা হয়েছে। এতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কৃষি ও জনজীবনে ভোগান্তি বেড়েছে। পরিবেশেরও মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে।
খালের পানির জায়গা জুড়ে কচুরিপানার ছড়াছড়ি। কোথাও কোথাও পুরো খালজুড়ে সবুজে ঢাকা কচুরিপানার স্তর দেখে মনে হয় যেন ধানক্ষেত বা তৃণভূমি। অনেক জায়গায় এসব কচুরিপানা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি।
স্থানীয় এলাকাবাসীদের সূত্রে জানাগেছে, কিছু খাল নামমাত্র ইজারা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বটিয়াঘাটা সদর এলাকার হেতালবুনিয়া খালের দুইপাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান ও ভবন। প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব দখল চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আড়াআড়ি বাঁধ, টোনাজাল, কারেন্টজাল, পাটাতন বেড়া ইত্যাদি স্থাপন করে মাছ চাষ চলছে, যা খালের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক জায়গায় খালের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ি, দোকানঘর এমনকি পাকা প্রাচীরও।
এ অবস্থার কারণে বোরো ও রবি মৌসুমে সেচের সংকট দেখা দিয়েছে। আগে যেখানে কৃষকরা সহজে খালের পানি ব্যবহার করে ধান ও তরমুজ চাষ করতেন, এখন সেখানে পানির অভাবে জমি অনাবাদী পড়ে থাকে। শুকনো মৌসুমে খালগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় সেচ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, খাল খনন ও কচুরিপানা অপসারণ না হলে আগামী মৌসুমে কৃষিতে চরম বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
জাতীয় কৃষক সমিতির খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি গৌরাঙ্গ প্রসাদ রায় বলেন, ‘নদী-খাল সংরক্ষণের দায়িত্বে যারা আছেন তারা অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করেন। আইন থাকলেও তা কার্যকর না হওয়ায় এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এর ফলে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোপাল কুমার দত্ত জানান, ‘এখন পর্যন্ত কচুরিপানা বা পানি প্রবাহ সমস্যার বিষয়ে কোনো জনপ্রতিনিধি আমাদের জানায়নি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে, নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শোয়েব শাত-ঈল ইভান বলেন, ‘ইতোমধ্যে কয়েকটি খালের অবৈধ দখলমুক্ত করা হয়েছে। সার্ভেয়ারদের মাধ্যমে সকল সরকারি খাল ম্যাপ অনুযায়ী চিহ্নিত করে সীমানা পিলার স্থাপন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
বটিয়াঘাটার সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত খাল খনন, কচুরিপানা অপসারণ ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের ব্যবস্থা নিতে হবে। নচেৎ অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সবই বিপন্ন হয়ে পড়বে।