খুলনা নগরীর চকচকে দালান, উজ্জ্বল সড়ক আর আলো ঝলমলে শপিংমলের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা-এই নগরীতে তিন শতাধিক বস্তিতে প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন লড়ছে বেঁচে থাকার সংগ্রামে। দারিদ্র্য, মৌলিক সুবিধার অভাব, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ-সব মিলিয়ে খুলনার বস্তিগুলো আজ শহরের অবহেলিত মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুলনা মহানগরের যে উন্নয়নের গল্প বলা হয়, সেখানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা কেউ বলে না। রূপসা, ওয়াপদা, গ্রীন লাইন, রেলওয়ে কলোনি কিংবা দৌলতপুর এলাকার বস্তিগুলো আজ মানবিক বিপর্যয়ের অন্য নাম। স্কুলছুট শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, মেয়েরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে, মায়েরা দিন কাটাচ্ছেন পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে। অথচ স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত প্রকল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। বস্তিগুলোর পানির সংকট, নোংরা ড্রেন, অপ্রতুল টয়লেট-সবই বহু পুরনো সমস্যা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সমাধানের উদ্যোগ কার্যত নামমাত্র। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউএনডিপির গবেষণায় দেখা গেছে, এখনও ২০ শতাংশ বস্তিবাসী খোলা বাথরুম ব্যবহার করেন; যা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, মানবিক মর্যাদারও অবমাননা। ওয়াসার পানি সংযোগ নেই অর্ধেকেরও বেশি বস্তিতে। এ অবস্থায় জনগণের করের টাকায় পরিচালিত সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন-এটি শুধু অবকাঠামোর সংকট নয়, এটি পরিকল্পনা ও নীতির ব্যর্থতা। প্রকল্পের স্থায়িত্ব নেই, দায়িত্বের ধারাবাহিকতা নেই, আর নেই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি। কিছু এনজিও সীমিত পরিসরে কাজ করলেও সরকারি কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব।
মনে রাখতে হবে, বস্তিবাসীরাও এই শহরের নাগরিক। তাদেরও সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার আছে-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপদ বাসস্থান। রাষ্ট্র যদি এই জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে ব্যর্থ হয়, তবে নগর উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। এখনই সময় খুলনা সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, কেডিএ এবং সরকারকে সমন্বিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার। প্রতিটি বস্তিকে আলাদা ইউনিট ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, ড্রেনেজ ও আবাসন সুবিধার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তবেই উন্নয়নের আলো বস্তির অন্ধকারেও পৌঁছাবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন শহরের প্রান্তিক শিশুটিও স্কুলে যেতে পারবে-যখন উর্মির মতো কোনো কিশোরীকে সংসারের দায়ে পড়াশোনা ছাড়তে হবে না। এখন প্রশ্ন একটাই-খুলনার বস্তিবাসীর কষ্ট কি দেখার কেউ নেই, নাকি রাষ্ট্রের বিবেকই নিদ্রায়?











































