Home খেলাধুলা শাস্তি কমাতে নিজের সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন রোনালদো

শাস্তি কমাতে নিজের সাফল্যের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন রোনালদো

0

স্পোর্টস ডেস্ক।।

জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার পর বলেছিলেন, কোনো ছাড় ছাড়াই শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত তিনি। অধিনায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব আরও বেশি, সেটিও স্বীকার করেছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

কিন্তু শৃঙ্খলা কমিটির তদন্তে শাস্তি কমানোর জন্যই নানা যুক্তি তুলে ধরেন পর্তুগিজ মহাতারকা। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অর্জন, ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং দেশের ফুটবলে অবদানের কথা মনে করিয়ে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই যুক্তিগুলো আমলে নিয়ে শাস্তিও কমিয়েছে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন। গত সেপ্টেম্বরে ডেনমার্কে পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সোমবার রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও ২৫৫ ইউরো জরিমানা করে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ)।

আজ (২১ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শাস্তি কমানোর পেছনের বিস্তারিত ঘটনা।

ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটির প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী রোনালদো মূলত তিনটি যুক্তিতে শাস্তি কমানোর আবেদন করেন।

চলতি মৌসুম ও আগের তিন মৌসুমে তার শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড, ফুটবলে অসাধারণ অবদান ও ক্রীড়াক্ষেত্রে অর্জিত স্বীকৃতি এবং তদন্তে সত্য উদ্‌ঘাটনে সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি।
নিজের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্লাব ফুটবলে জেতা বিভিন্ন শিরোপার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যগুলোর কথাও উল্লেখ করেন রোনালদো।

২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও দুইবার উয়েফা নেশন্স লিগ জয়ের কৃতিত্ব তুলে ধরেন পর্তুগাল অধিনায়ক। ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয়ের বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু মাঠের অর্জনই নয়, দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সম্মাননার কথাও মনে করিয়ে দেন আল নাসর ফরোয়ার্ড।

রোনালদোর এসব যুক্তি গ্রহণ করে শৃঙ্খলা কমিটি। দেশের ফুটবলে অবদান ও অর্জনের কারণে সম্ভাব্য শাস্তির মাত্রা অর্ধেকে নামানো হয়। পরে নিজের দায় স্বীকার করায় শাস্তির সীমা আরও কমানো হয়।

ফেডারেশনের বিধিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে এক থেকে ছয় মাস পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে। তবে রোনালদোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্ন ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

অথচ জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বিবৃতিতে ভিন্ন অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন রোনালদো।

সেখানে নিজের ভুল স্বীকার করে বলেছিলেন, পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন যে শাস্তিই দিক, তা মেনে নেবেন তিনি। এমনকি অধিনায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব বেশি হওয়ায় সেটিকে শাস্তি বাড়ানোর কারণ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত বলে জানিয়েছিলেন।

কিন্তু তদন্তে নিজের সাফল্য ও অবদানের কথা তুলে ধরে শাস্তি কমাতে সক্ষম হলেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যান রোনালদো।

এর আগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে পুরো সময় বেঞ্চে কাটাতে হয়েছিল তাকে। এরপর ডেনমার্কের বিপক্ষেও শুরুর একাদশে জায়গা পাবেন না জানার পর কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় তার।

রোনালদোর অভিযোগ ছিল, দলে তার ভূমিকা নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি দুবার ভঙ্গ করেছেন জেসুস। যদিও কোনো ধরনের সমঝোতার কথা অস্বীকার করেন পর্তুগাল কোচ।

শৃঙ্খলা কমিটির নথিতে বলা হয়েছে, ক্যাম্প ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে জেসুস স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, দল পরিচালনা ও একাদশ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত একান্তই তার। কোনো ফুটবলারের প্রভাবে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাবেন না তিনি।

এরপর ফেডারেশনের কাছে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করতে বলেন রোনালদো। সেই গাড়িতে করেই রওনা দেন কোপেনহেগেন বিমানবন্দরের উদ্দেশে।

পথে এফপিএফ সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েন্সাকে ফোন করেন তিনি। জানান, জাতীয় দলের সঙ্গে থাকার মতো মানসিক অবস্থায় নেই।

তবে ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে থেকে ফেডারেশন কিংবা জাতীয় দলের দায়িত্বশীল কাউকে অবহিত করেননি রোনালদো।

শৃঙ্খলা কমিটির রায়ে বলা হয়েছে, ‘স্টেডিয়াম ও জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার ইচ্ছার কথা আগে থেকে ফেডারেশন কিংবা জাতীয় দলের কর্মকর্তাদের জানাননি বা কোনো ব্যাখ্যাও দেননি অভিযুক্ত ফুটবলার।’

৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় দলের ৩০টির বেশি কার্যক্রমে অনুপস্থিত ছিলেন রোনালদো। এর মধ্যে ছিল অনুশীলন, সফর, দলের সঙ্গে খাবার গ্রহণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম।

ক্যাম্প ছাড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও বিতর্কের জন্ম দেন রোনালদো।

ইনস্টাগ্রামে তিনি জানিয়েছিলেন, জাতীয় দল ছাড়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে যথাসময়ে পর্তুগালের মানুষকে ‘পুরো সত্য’ জানাবেন।

ফেডারেশনের শৃঙ্খলা কমিটির মতে, এমন মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বিশ্বজুড়ে রোনালদোর পরিচিতি ও প্রভাবের কারণে তার যেকোনো বক্তব্য যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিতে পারে, সেটি তার অজানা থাকার কথা নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

কমিটির মতে, কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল রোনালদোর।

কিন্তু ক্যাম্প ছাড়ার দিনই ইনস্টাগ্রামে পরবর্তী সময়ে সব সত্য প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে জনমনে কৌতূহল ও জল্পনা আরও বাড়িয়েছেন তিনি।

অবশ্য পরে নিজের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন রোনালদো। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সমর্থকদের অভিবাদন না জানানো এবং সতীর্থদের ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যও ক্ষমা চান তিনি।

দায় স্বীকার ও অনুশোচনার বিষয়টিও শাস্তি কমানোর ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিয়েছে শৃঙ্খলা কমিটি।

রোনালদোর ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে কার্যকর হচ্ছে, যখন পর্তুগালের কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই। ফলে এই শাস্তির কারণে আপাতত জাতীয় দলের কোনো ম্যাচে তার অনুপস্থিত থাকার কথা নয়।

আগামী ১৪ নভেম্বর ব্রাগায় নেশন্স লিগে ডেনমার্কের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল।

তবে সেই ম্যাচে রোনালদো ফিরবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। অভিজ্ঞ এই ফরোয়ার্ড জাতীয় দলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেবেন কি না কিংবা কোচ জেসুস তাকে আবার দলে ডাকবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যদিও এর আগে জেসুস রোনালদোর ফেরার দরজা খোলা রাখার কথা জানিয়েছিলেন। ফেডারেশন সভাপতি প্রোয়েন্সাও তাকে আবার জাতীয় দলে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

আপাতত শৃঙ্খলাজনিত এই ঘটনায় তুলনামূলক কম শাস্তি পেয়েই পার পাচ্ছেন রোনালদো। তবে জাতীয় দলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের এই অস্বস্তিকর অধ্যায়ের শেষ কোথায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।