
মূল লড়াই নৌকা বনাম ধানের শীষ * মেয়র পদে লড়ছেন ১৩ জন প্রার্থী * কাউন্সিলর প্রার্থী ৫৭৭ জন ও বিদ্রোহী ১৪৮ জন * ভোটগ্রহণ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত * সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ * কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে দুই সিটির নির্বাচনি এলাকা *৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।

- আসাদুজ্জামান ইমন, ঢাকা
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ শনিবার (০১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো ঢাকার দুই সিটিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) একযোগে ভোট নেবে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি। ভোটার সংখ্যা এবং যেকোনো বিবেচনায় এটি-ই এখন পর্যন্ত ইভিএমে সবচেয়ে বড় নির্বাচন। ভোট উপলক্ষে নির্বাচনি এলাকায় সাধারণ ছুটি। টানা ২১ দিনের শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সব রকম প্রচার-প্রচারণা শেষে এখন জনরায়ের অপেক্ষা। ভোট উৎসবের পাশাপাশি সংঘাতের শঙ্কাও রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রে ভোট হলেও এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে বিএনপি। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে ভোট সুষ্ঠু হবে। শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, অনেকগুলো কেন্দ্র দেখেছি। নির্বাচনের সামগ্রী বিতরণও দেখেছি। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানালেন, কোনও অসুবিধা নেই। নির্বাচনি মালামাল পৌঁছে গেছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা বলেছেন কোথাও কোনও রকমের আশঙ্কা দেখছেন না তারা। সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন কারও সহায়ক না, কারও পক্ষে বা বিপক্ষেও না। সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে আইন অনুযায়ী কমিশন দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেন, ভোটার, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, ভোট কেন্দ্রে প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

অবৈধ ভোট দিলেই সর্বোচ্চ শাস্তি: অবৈধভাবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিলে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ভোটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য গঠিত মনিটরিং সেলের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুল ইসলাম।
শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা, ইভিএমসহ সর্বশেষ প্রস্তুতির বিষয়ে গণমাধ্যমকে ব্রিফিংকালে তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। সাইদুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে কনফিউশন বা সমস্যা হয়। প্রিজাইডিং অফিসার অথবা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিজাইডিং অফিসাররা ভোটারের আঙুলের ছাপ নিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করার পরেও ভোট দিতে পারবেন না, তিনি শুধু সমস্যা চিহ্নিত করার পর ব্যালট ওপেন করে দিতে পারবেন। কারণ তার দায়িত্ব কেন্দ্রের নির্বাচন পরিচালনা করা। তবে যাদের সমস্যা তাদের জন্য বলেছি তারা ১ শতাংশ ভোটারের সহযোগিতা করার জন্য ব্যালট ওপেন করে ভোটারকে ভোটের অনুমতি দিতে পারবেন। তিনি বলেন, ঢাকা দুই সিটিতে ২৮ হাজার ৮৭৮টি ইভিএম সেট প্রস্তুত রয়েছে। একটা অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে আমরা বদ্ধপরিকর।
সাইদুল ইসলাম আরও বলেন, যদি কেউ অবৈধভাবে কারও ভোট দিতে চায় সেক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা থাকবে। কারণ যাদের ভোটের জন্য অফিসার ব্যালট ওপেন করে ভোটের অনুমতি দেবেন তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট ক্যাপচার করে রাখা হবে। পরে আমরা এটা চেক করবো, ভার্চুয়াল চেকিংয়ের পর মূল সার্ভারের সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখা হবে। কেউ অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বৈধ ভোটারকে ভোট প্রদানে সহযোগিতা করার জন্য কমিশন বদ্ধপরিকর। প্রমাণ করতে চাই আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষম।

ভোটার চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি চিহ্নিত করার জন্য তার এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) নম্বর দিলে তাকে চিহ্নিত করতে পারবো। স্মার্ট কার্ড নিয়ে আসলেও ভোটারকে শনাক্ত করতে পারবো। পোলিং এজেন্টদের সামনে শনাক্তের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হবে। তবে কোনও ভোটারের কাছে যদি কিছুই না থাকে সে ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা দেখে নম্বর দিলে কন্ট্রোল ইউনিটে তথ্য বের হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ম অনুসরণ করে ১ শতাংশ ভোটারের ব্যালট ওপেন করতে পারবেন প্রিজাইডিং অথবা সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার। এর বেশি লাগলে বিষয়টি দেখবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। প্রয়োজনে তিনি ইসির মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করতে পারবেন।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) অনু-বিভাগের মহাপরিচালক বলেন, কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। আশা করি, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবো। ভোটকক্ষ চিহ্নিত করে ভোটের জন্য উপযোগী করতে সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সবাইকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ৬৫ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মাঠে নেমেছে। ১০ প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ থাকবে। সব বাহিনী মিলে ৫০ হাজারের মতো ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। বিধি অনুযায়ী, ভোটের ৩২ ঘণ্টা আগে প্রচারণা শেষ হয়েছে। আজ ১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) দুই সিটিতে ভোট রয়েছে। এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একযোগে সব কেন্দ্রে ভোট চলবে ইভিএমে। ভোটের দু’দিন আগে ৩০ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) থেকে ১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। দুই সিটিতে আইন-শৃঙ্খলায় থাকবেন পুলিশের মোবাইল টিমের ১ হাজার ২৯০ সদস্য, পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্সের ৪৩০ সদস্য, ৫২ জন রিজার্ভ পুলিশ, ১ হাজার ৪৩০ র্যাব সদস্য, ২ হাজার ২৫০ বিজিবি সদস্য, ভোটকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৪১ হাজার ৯৫৬ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
সবমিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৪৭ হাজার ৮৭৬ ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে দায়িত্ব পালন করবেন। থাকবে নৌপুলিশও। নির্বাচনে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি নিয়োগ করা হয়েছে। সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন করে ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
ভোট কর্মকর্তা: দুই সিটিতে মোট প্রিজাইডিং অফিসার থাকবেন ২ হাজার ৪৬৮ জন, সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার থাকবেন ১৪ হাজার ৪৩৪ জন এবং পোলিং অফিসার থাকবেন ২৮ হাজার ৮৬৮ জন। কারিগরি সহায়তায় (সেনাবাহিনী) থাকবেন ৪ হাজার ৯৩৬। সবমিলে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা থাকবেন ৫০ হাজার ৭০৬ জন।

ভোটার সংক্রান্ত তথ্য: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট সাধারণ ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৪টি ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৮টি। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন ও পুরুষ ভোটার ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ জন। ভোটকেন্দ্র ১ হাজার ৩১৮টি ও ভোটকক্ষ ৭ হাজার ৮৪৬টি। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা ৭৫টির মধ্যে সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড আছে ২৫টি। দক্ষিণ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪৪১ এবং নারী ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩। ভোট কেন্দ্র ১ হাজার ১৫০টি ও ভোটকক্ষ ৬ হাজার ৫৮৮টি।
৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ: দুই সিটি নির্বাচনে ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ (গুরুত্বপূর্ণ)। তাই এসব কেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত ফোর্স নিয়োগ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাসেম জানান, উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ৮৭৬টি। সাধারণ কেন্দ্র ৪৪২টি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন জানান, দক্ষিণ সিটিতে ভোটকেন্দ্র আছে ১ হাজার ১৫০টি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ৭২১টি। সাধারণ কেন্দ্র ৪২৯টি।
দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার দেয়া তথ্য একীভূত করলে দেখা যায়, দুই সিটিতে ২ হাজার ৪৬৮ কেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৫৯৭টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ কেন্দ্র ৮৭১টি। অর্থাৎ ৬৪ দশমিক ৭১ শতাংশ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেয়া তথ্যানুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ কেন্দ্রের তালিকা করেছেন।
লড়ছেন যারা: নির্বাচনে মেয়র পদের লড়াইয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে রয়েছেন ছয়জন এবং দক্ষিণে সাতজন। উত্তরের মেরপ্রার্থীরা হলেন- আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম, বিএনপির তাবিথ আউয়াল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মোহাম্মদ ফজলে বারী মাসউদ, সিপিবির আহম্মেদ সাজেদুল হক রুবেল, এনপিপির আনিসুর রহমান দেওয়ান ও পিডিপির শাহীন খান।
দক্ষিণে লড়ছেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস, বিএনপির ইশরাক হোসেন, জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুর রহমান, এনপিপির বাহারানে সুলতান বাহার, গণফ্রন্টের আবদুস সামাদ সুজন ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের আকতারুজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ।
অন্যান্য তথ্য: ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর জানান, প্রয়োজনে মাঠ প্রশাসন তাৎক্ষণিক যেখানে যেমন দরকার সে অনুযায়ী যে কোনও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োজিত করার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন ও অপরাধের বিচার কাজের জন্য দুই সিটিতে ১২৯ জন নির্বাহী হাকিম ও ৬৪ জন বিচারিক হাকিম নিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে ৫৪ জন ও দক্ষিণ সিটিতে ৭৫ জন নির্বাহী হাকিম ২ ফেব্রুয়ারি (রোববার) পর্যন্ত নির্বাচনি মাঠে থাকবেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকার এ দুই সিটি নির্বাচন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে দেশবাসী ও বিদেশিরা। এ নির্বাচনে মোট ২২ প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ১৩ দেশি পর্যবেক্ষক কাজ করবেন। তাদের মধ্যে উত্তরে ৫০৩, দক্ষিণে ৪৫৭ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ৫৩ পর্যবেক্ষক পর্যবেক্ষণ করবেন।
বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবেন মোট ৭৪জন। তাদের মধ্যে ৪৬ বিদেশি এবং ২৮ বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।










































