যশোর অফিস।।
কোনো কোনো স্কুলের অস্তিত্বই নেই বাস্তবে, আবার কোথাও বহু বছরের পুরনো রাস্তায় নতুন কাজ দেখিয়ে পকেটে পোরা হয়েছে টাকা। কাগজে-কলমে প্রকল্প শতভাগ শেষ, যথারীতি বিলও উঠে গেছে; কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে মিলছে শুধু জালিয়াতি আর দুর্নীতির ছাপ। যশোরের অভয়নগর উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) লাখ লাখ টাকা নয়ছয় ও ভুয়া প্রকল্পের নামে হরিলুটের এমনই এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।
অস্তিত্বহীন স্কুলে দুই লাখের বরাদ্দ: এডিপির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দের অধীনে সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের ‘সিদ্দিপাশা ভৈরব কিন্ডারগার্টেন স্কুল’ সংস্কারের জন্য দুই লাখ টাকা ছাড় করা হয়। তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই নামে কোনো স্কুলের অস্তিত্বই নেই গোটা উপজেলায়! ভুয়া এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে বিল তুলে নেন সিদ্দিপাশা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আবুল কাশেম। অনিয়ম ফাঁস হতে দেখে তড়িঘড়ি করে পার্শ্ববর্তী একটি বেসরকারি স্কুলে ৬টি জানালার গ্রিল দিয়ে, ২ জোড়া দরজা-জানালা ও ২০ সেট বেঞ্চ পাওয়ার ভুয়া প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেন ইউপি চেয়ারম্যান।
পুরনো রাস্তায় ইট নেই, ইউড্রেনের হদিস নেই: সিদ্দিপাশা ইমান আলীর বাড়ি থেকে আকরামের বাড়ির রাস্তা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮০ হাজার টাকা। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছেন, ৪-৫ বছর আগের তৈরি এই পুরনো রাস্তায় এক টুকরো নতুন ইটও পড়েনি, অথচ শতভাগ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য প্রকল্পেও। পায়রা ইউনিয়নের দামুখালী ও প্রেমবাগ ইউনিয়নে কালভার্ট বা ইউড্রেন নির্মাণের কথা বলে টাকা তুলে নেওয়া হলেও প্রকল্প এলাকাগুলোতে নতুন কোনো ইউড্রেনের অস্তিত্ব মেলেনি। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী তৎপরতা শুরু হলে উপসহকারী প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যানদের তড়িঘড়ি করে নামমাত্র কাজ করিয়ে দায় ঢাকার চেষ্টা করতে দেখা যায়।
অনিয়মের আস্তানা ‘পিআইসি’ ও স্বজনপ্রীতি: অভয়নগরে এডিপির আওতায় ৩ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দে ২২৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১১৭টিই করা হয়েছে দরপত্র ছাড়া ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি’ (পিআইসি)-র মাধ্যমে। স্থানীয়দের মতে, এসব পিআইসি প্রকল্পগুলো গোপনে গ্রহণ করে মূলত লোপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়।
দরিদ্র পরিবারের অগভীর নলকূপ বিতরণ প্রকল্পেও ঘটেছে স্বজনপ্রীতি। তালিকায় নাম থাকা আসল দরিদ্ররা নলকূপ পাননি, অথচ প্রেমবাগ ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নিজের স্ত্রী লাইলী আক্তারের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন সরকারি নলকূপ।
প্রশাসনের নীরবতা ও সুধী সমাজের ক্ষোভ: অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসব বরাদ্দ পাস হলেও টাকা তোলা হয় পরবর্তী সময়ে। প্রকল্পের তৎকালীন তদারকি কর্মকর্তা এবং এলজিইডি প্রকৌশলীরা ফোন এড়িয়ে চলায় কিংবা দায় এড়ানোর বক্তব্যে দুর্নীতির বিশালতার ইঙ্গিত মিলেছে। ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদসহ স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, জনগণের টাকার এমন প্রকাশ্য হরিলুট বন্ধ করতে এডিপির প্রকল্প বাস্তবায়নে গণশুনানি ও জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। ভুয়া ও অকার্যকর প্রকল্প দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রটির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও কঠোর আইনি তদন্তের দাবি উঠেছে।










































