Home Lead দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি: প্রতিদিনে গড়ে ১০ খুন

দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি: প্রতিদিনে গড়ে ১০ খুন

11


বিশেষ প্রতিনিধি
রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চক্রান্ত, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ আর সশস্ত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর মুখোমুখি সংঘাতÑসব মিলিয়ে সারাদেশজুড়ে এখন পিস্তল ও গুলির মহড়া। অপরাধীদের হাতে অবৈধ অস্ত্রের অবারিত ব্যবহারে একের পর এক খুন ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডে (টার্গেট কিলিং) চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। পুলিশ সদর দপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে।
তিন মাসে ৯১৫ খুন, শীর্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রাম: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত মার্চ থেকে মেÑএই তিন মাসে সারাদেশে মোট ৯১৫টি খুনের মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি খুনের ঘটনা ঘটে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে খুনাখুনির তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা রেঞ্জ, যেখানে তিন মাসে ২০৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পরেই ১৮৬টি ঘটনা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ। এ ছাড়া রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনা রেঞ্জে ৮৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। কেবল ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই দিনদুপুরে একের পর এক হামলায় ৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
টার্গেট এখন রাজনৈতিক নেতারা, আতঙ্কের নাম ‘রাউজান’: সাম্প্রতিক খুনাখুনিগুলোর মূল টার্গেট হচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস-এর তথ্যমতে, গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তিন মাসে রাজনৈতিক সংঘাতের ২০০টিরও বেশি ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তালিকায় বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে চট্টগ্রামের রাউজান। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে কেবল এ এক উপজেলাতেই অন্তত ২৫ জন নিহত হয়েছেন, যার ১৮টিই ঘটেছে রাজনৈতিক কোন্দলে। সম্প্রতি রাউজানে প্রকাশ্য বাজারে অটোরিকশায় এসে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী ও নিজ বাড়ির সামনে জানে আলম সিকদারকে গুলি করে হত্যার ঘটনা পুরো এলাকাকে আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে। একইভাবে খুলনায় বিএনপি কর্মী ও প্রাক্তন রূপসা শ্রমিক দল সভাপতি মাসুম বিল্লাহ হত্যা, মসজিদের ভেতর গুলিবর্ষণ এবং ঢাকার রামপুরায় কারাগার থেকে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কাইল্যা পলাশ’ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় স্পষ্ট যে, গডফাদাররা জামিনে বা বিদেশ থেকে ফিরে পুরনো আধিপত্য ফেরাতে কতটা হিংস্র হয়ে উঠেছে।
সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে বিদেশি অস্ত্র, অপহৃত অস্ত্র এখনো অধরা: তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অপরাধে ব্যবহৃত বেশির ভাগ অস্ত্রই আসছে সীমান্ত পার হয়ে। গত দেড় বছরে কেবল যশোর সীমান্ত এলাকাতেই ৬২টি খুনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, তুরস্ক ও চীনে তৈরি অত্যাধুনিক পিস্তল, একে রাইফেল ও ‘বেলঘরিয়া পিস্তলের’ মতো মারাত্মক অস্ত্রের সন্ধান মিলেছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ৯৪৫টি অস্ত্রের মধ্যে এখনো প্রায় ১৬৫টি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা সরাসরি অপরাধীদের হাতে চলে গেছে।
অভিযান অব্যাহত, উদ্ধার পৌনে দুই মাসে ১৫৩ অস্ত্র: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত পহেলা মে থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১,৭৮৫ রাউন্ড গুলি, ৫২টি ম্যাগজিন, হাতবোমা এবং বিপুল পরিমাণ গানপাউডার জব্দ করা হয়েছে। তবে দেশের সচেতন মহল মনে করছেন, যে হারে খুনাখুনি বাড়ছে, তার তুলনায় অবৈধ অস্ত্রের মজুদ এখনো অনেক বেশি। দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ পথ ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না করা গেলে এই রক্তপাত থামানো কঠিন হবে।