খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দিঘিরপাড় বাজারে বনজঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট একটি পরিত্যাক্ত ভবন। ভাঙাচোরা টিনের চালের ওই ভবনের কক্ষগুলোর সব দরজা-জানালা চুরি কিংবা খুলে নেয়া হয়েছে অনেক আগেই। ভেতরের কাঁদাপানি মাখা চেয়ার-টেবিল ঘুন ধরে ভেঙে ভেঙে পড়ছে। মেঝেতে জমে থাকা পানিতে বাসা বেধেছে কীটপতঙ্গ। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের এক কোণায় অস্পষ্টভাবে লেখা ‘ম্যানেজারের কক্ষ’। ঝোপঝাড়ের মাঝে জীর্ণদশায় উঁকি দেয়া ভবনটি জানান দেয়, সেখানে মানুষের যাতায়াত নেই বহু বছর।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্যে দেশের ৭৩টি সংস্থাকে নিবন্ধন দিতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংস্থাগুলোর আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি। সেই তালিকায় রয়েছে যশোরের দু’টি সংস্থা। যার একটি সার্ভিসেস ফর ইকুয়িটি অ্যান্ড ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্ট (সীড)। সংস্থাটির কার্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে দিঘিরপাড় বাজারের এই পরিত্যাক্ত জীর্ণ ভবন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের প্রাথমিক অনুমতি পাওয়া যশোরের অপর প্রতিষ্ঠান ‘দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র কার্যালয় ও কার্যক্রমের ব্যাপ্তি বড় হলেও রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। হাসিনা সরকার আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে প্রকল্পের কয়েক কোটি টাকাসহ কর্মীদের দমন-পীড়নের মাধ্যমে বেতন-ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলমান রয়েছে। এই দু’টি প্রতিষ্ঠান এর আগে বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনেও পর্যবেক্ষণের অনুমতি পেয়েছিল।
২০২৪ এর বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি প্রাপ্তিকালেও কার্যালয়টি ছিল পরিত্যাক্ত। তবে তখন বনজঙ্গল ঘেরা পরিত্যাক্ত ভবনটির সামনে ছিল একঠা ছেঁড়াকাঁটা প্যানা সাইনবোর্ড। রোববার সকালে নির্বাচন কমিশনে দেয়া সীড এর ঠিকানায় গিয়ে দেখা মেলেনি সাইনবোর্ডটিরও। স্থানীয়রা জানান, ৬ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিত্যক্ত। এখন তারা কী কাজ করে তা জানেন না। এমন একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো স্পর্ষকাতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় তারা বিস্মিত।

দিঘিরপাড় বাজারের পাশের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ জামাল সরদার জানান, ‘৫-৬ বছর ধরে এখানে কেউ আসে না। আগে যখন অফিস ছিলো মাসে দু’একবার খোলা দেখতাম। এখন পুরোপুরি বন্ধ। পরিত্যক্ত ভবনের আশেপাশে কচুগাছ, ডুমুরগাছ, বনজঙ্গল ভরে। বাজারের দোকানপাটের ময়লা ও বাজারে আসা লোকজন ভবনটির পাশে ও ভেতরে প্রসাব করে। তাদের এখন কোন কার্যক্রম নেই। তবে এই ঠিকানায় কোন চিঠি আসলে পাশে একটি স্কুলে পৌঁছে দিয়ে যায়। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই জামাল সরদারের কথার সত্যতা মিললো। বনজঙ্গল মাড়িয়ে প্রবেশ করতেই ভবনের ভেতরে বিশাল ভিমরুলের বাসা। ভাঙ্গা জানালা দরজায় মাকড়সার জাল। ম্যানেজারের কক্ষে ফাইলের বিভিন্ন তাক থাকলেও সেগুলো ভাঙ্গা ও ফাঁকা। ম্যানেজারের চেয়ার টেবিল ভেঙ্গে একপাশে পড়ে রয়েছে। মলমূত্রে দুগন্ধে সেখানে কয়েক মিনিটের বেশি দাঁড়ানো যায়নি। ভবনটির পাশে বনজঙ্গল এতটাই বড় হয়েছে, সড়ক থেকে পরিত্যক্ত ভবনটি দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় এক দোকানদাররা জানান, এমএ আকবর হোসেন নামে স্থানীয় একজন আশির দশকে এনজিওটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমদিকে নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে এলাকায় এডাল্ট এডুকেশন নিয়ে কাজ করতেন। পরে একটি দুর্ঘটনায় ২০০৬ সালে আকবর মারা গেলে এনজিওটি মুখ থুবড়ে পড়ে। পরে দায়িত্ব নেয় তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা। দিঘিরপাড় এই অফিসটা মাঝে মধ্যে এক সময় খুলতো। আম্পান ঝড়ের সময় ভবনটি একেবারেই ভেঙ্গে যায়। গত সংসদ নির্বাচনের আগে একটা সাউনবোর্ড বসিয়েছিলো। কিন্তু তারা অফিস করতো না। আর এখনতো সাইনবোর্ডও নেই।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা এলাকায় থাকেন না। বাস করেন ঢাকাতে। মুঠোফোনে তিনি জানান, এনজিওটির এখন কার্যক্রম নেই। তবে প্রজেক্ট পেলে কাজ করেন। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বীজের একটি প্রকল্পের জন্যে আবেদন করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, গত সংসদ নির্বাচনেও ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও ফরিদপুরের ভাঙাতে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে সীড। এবারও সীড চুড়ান্তভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্বটি পাবে বলে তিনি আশাবাদী।
কার্যালয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি জানান, ভবনের জমি নিয়ে মামলা চলছে ফলে ওখানে কার্যক্রম হয় না। আপাতত বাড়িতে কার্যক্রম পরিচালনা হয়। আর নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্যে চুড়ান্তভাবে বিবেচিত হলে প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা দায়িত্বটি পালন করবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিবন্ধন দেয়ার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন যে তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে সীড’র সভাপতি হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে জন এস বিশ্বাসের। তিনি বলেন, ওদের কোনো অ্যাক্টিভিটিজ এখন আমি আর দেখি না। ফলে আমি আছি কিনা আমি নিজেও জানি না। অবশ্য পরক্ষণেই বলেন, তবে কাজ করে ওরা। আর বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন তিনি। অথচ ২০২৪ এর নির্বাচনের সময় ইসিতে জমা দেয়া আবেদনে সীড’র সভাপতি হিসেবে নাজনীন ইসলাম নামে একজনকে। নাজনীনের ঢাকায় এনজিও আছে। সেখানে তার সঙ্গে কাজ করতেন রেবেকা সুলতানা।

পর্যবেক্ষকের তালিকায় নাম থাকা যশোরের অপর প্রতিষ্ঠান ‘দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় পরিচালিত ‘সেকেন্ড চান্স এডুকেশন প্রকল্পে’ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। সরকারের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থা কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বলে অভিযোগে তোলেন ভূক্তভোগীরা। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্তরা সরাসরি রাজনীতিতে না জড়ালেও তৎকালীন সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা রেখে চলতেন। ওইসব নেতাদের ব্যবহার করে নিজপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান না করেই জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়ারও অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বিভাগীয় তদন্তেও উঠে আসে অভিযোগের সত্যতা। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠানটির এসব আর্থিক অনিয়ন-দুর্নীতি তদন্ত করছে।
দিশা’র নির্বাহী পরিচালক রাহিমা সুলতানা বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারী সংখ্যা ২৫ জন। এছাড়াও বিশাল কর্মী বাহিনী রয়েছে। ফলে এবারও তারা কাজটি সুন্দরভাবে শেষ করতে পারবেন।
দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, দিশা’র যেসব প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো সঠিকভাবে শেষ হয়েছে। কাজের সনদও নেয়া হয়েছে। আর দুদক এখনও মামলা করেনি। তাদের তদন্ত প্রাথমিক অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। ফলে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই।
এদিকে, এমন বিতর্কিত ও নামসর্বস্ব সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ার প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ যশোরের নাগরিক প্রতিনিধিরা। টিআইবি পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), যশোরের সভাপতি অধ্যক্ষ পাভেল চৌধুরী বলেন, আগামী নির্বাচনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে এ জাতীয় ভূঁইফোড় ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মত স্পর্ষকাতর দায়িত্ব পালনের অনুমতি প্রদান কোনভাবেই সমর্থন যোগ্য না। কারণ এ জাতীয় সংগঠন দায়িত্বে থাকলে নি:সন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী ও ব্ল্যাস্ট যশোরের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর জানান, বিগত সময়েও যশোরে বিভিন্ন ভুঁইফোড় ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তখন নির্বাচন বির্তকিত হবার পেছনেও এটি ছিল একটি কারণ। বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। ফলে সুষ্ঠু-গ্রহনযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সেই পুরনো শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
যশোরের অতিরিক্ত নির্বাচন অফিসার শেখ শরিফুল ইসলাম জানান, নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি প্রক্রিয়া সরাসরি ইসি করে থাকে। এমনকি আবেদনও প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ঢাকাতে করে, সেখানে যাচাইবাছাই করে ইসি নির্বাচন পর্যবেক্ষকের চুড়ান্ত অনুমতি দেয়। আমাদের এখানে কোন কার্যক্রম নেই। তবে এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে অভিযোগ থাকলে ইসি অনাপত্তি আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।











































