Home স্বাস্থ্য কলাপাতায় খবার পরিবেশন হারানোর পথে

কলাপাতায় খবার পরিবেশন হারানোর পথে

5

মিলি রহমান।।
এক সময়ের প্রিয় সংস্কৃতি আজ হারাতে বসেছে আধুনিকতার ছোঁয়ায়। গ্রামবাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে খাবার পরিবেশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল কলাপাতা। বিশেষ করে মজলিশ, বিয়েবাড়ি, উৎসব কিংবা কৃষিকাজের সময় একসঙ্গে অনেককে খাওয়ানোর জন্য কলাপাতা ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যাবহারিক উপকরণ। শুধু পরিবেশবান্ধব বা সহজলভ্য বলেই নয়, বরং এটি ছিল ঐক্য, শুদ্ধতা ও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক প্রতীক।

সময়ের পালাবদলে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং সহজলভ্য ‘ওয়ান টাইম’ প্লেটের প্রচলনে এই ঐতিহ্য আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্ম তো দূরের কথা, আধা-শহুরে বা শহরের অনেক শিশু-কিশোর জানেই না কলাপাতায় ভাত খাওয়ার স্বাদ কেমন। স্কুল, পরিবার এমনকি গণমাধ্যমেও নেই এই ঐতিহ্যের চর্চা বা স্মৃতিচারণ। ফলে ধীরে ধীরে লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।

মাগুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামের কথা বলে জানা যায়, একসময় মজলিশ বা একচল্লিশা আয়োজনের কয়েকদিন আগেই স্থানীয় কলাগাছ থেকে কলাপাতা সংগ্রহে নেমে পড়তেন গ্রামের যুবকেরা। সেই পাতা ধুয়ে, মুছে প্রস্তুত করা হতো খাবার পরিবেশনের জন্য। মাটিতে খড় বা পাটের বস্তা বিছিয়ে সারিবদ্ধভাবে বসে শত শত মানুষ কলাপাতায় খেতেন ভাত, ডাল, সবজি ও অন্য খাবার। এটি শুধু খাওয়ার প্রক্রিয়া ছিল না, ছিল এক পারিবারিক-সামাজিক মিলনমেলা।

মাগুরা সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের মো. সুমন শেখ বলেন, ২০ বছর আগেও কলাপাতা ছাড়া কোনো মজলিশ কল্পনাই করা যেত না। এখন আর এসব দেখা যায় না, প্লাস্টিকের প্লেটেই সেরে ফেলা হয় সব আয়োজন।

শত্রুজিৎপুর ইউনিয়নের পয়ারী গ্রামের মো. ইসমাইল মন্ডল বলেন, আগে কলাপাতায় খাওয়ার আলাদা আনন্দ ছিল, পরিবেশও বিশুদ্ধ থাকত। এখন সেই সব দিন শুধুই স্মৃতি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ঐতিহ্যের দিক থেকে নয়, কলাপাতায় খাওয়ার রয়েছে স্বাস্থ্য উপকারিতাও। গবেষণায় দেখা গেছে, কলাপাতায় রয়েছে সাইট্রিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, সি ও ট্যানিন, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাছাড়া কলাপাতা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও সহজেই বায়োডিগ্রেডেবল হওয়ায় পরিবেশবান্ধব এক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত।

তবে বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য পেপার প্লেট, প্লাস্টিক বা থার্মোকল প্লেট ব্যবহারের ফলে আয়োজকরা আর সময়সাপেক্ষ কলাপাতা ব্যবহারে আগ্রহী নন। তদুপরি ‘ক্যাটারিং কালচার’-এর প্রভাবে খাবার পরিবেশনের ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিগুলোর স্থান নিচ্ছে আধুনিকতা।

তবুও সচেতন সমাজ বলছেন, চাইলেই এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে পিঠা উৎসব, গ্রামীণ খাবার মেলা বা পর্যটন প্যাকেজে কলাপাতা ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। স্কুল-কলেজে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে এই ঐতিহ্যের চর্চা করালে নতুন প্রজন্মের কাছে বিষয়টি পরিচিত হয়ে উঠবে। সামাজিক মাধ্যমেও কলাপাতায় খাবারের স্মৃতি ও ছবি ছড়িয়ে দিলে সৃষ্টি হতে পারে নতুন আগ্রহ।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে কলাপাতায় খাবার পরিবেশনের এই সংস্কৃতি কেবল স্মৃতিতে নয়, নতুন রূপে বর্তমানেও ফিরে আসুক এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন মহলের।