Home আঞ্চলিক সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক, সক্রিয় ৭ বাহিনী

সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক, সক্রিয় ৭ বাহিনী

3


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট


দীর্ঘদিন দস্যুমুক্ত থাকার পর সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুদের তৎপরতা। সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্য ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন অভিযানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত অন্তত সাতটি দস্যুবাহিনী বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। বনজীবী ও জেলেদের লক্ষ্য করে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও দস্যুতাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে এসব বাহিনী। ফলে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।


কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনকে ঘিরে বর্তমানে ১২টি দস্যুবাহিনীর শতাধিক সদস্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তবে ধারাবাহিক অভিযানে আছাবুর, হান্নান, আনারুল, মঞ্জু ও রাঙ্গা বাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বর্তমানে করিম শরীফ বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, নানা ভাই (ডন) বাহিনী এবং কাজল মুন্না (জনাব) বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ছোট ছোট উপদল বা ক্লোন বাহিনীও গড়ে উঠেছে।


কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুক্তিপণের অর্থ লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে একাধিক দস্যুকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু বনাঞ্চলেই নয়, স্থলভাগে অবস্থানকারী দস্যুদের বিরুদ্ধেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব চক্রের ইন্ধনেই সম্প্রতি মোংলার জয়মনি ঘোল এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটেছে।


গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এসব বাহিনী আবারও সুন্দরবনে সংগঠিত হতে শুরু করে। প্রতিটি বাহিনীতে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য থাকলেও কয়েকটি বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে সুন্দরবনের চকপাড়া বাজার, মাল্লাখালী, পুরাতন ঝাপসি, শিবসা নদীর আড় বাওয়ানী খাল, মুচিরদোয়ানি, কামারখোলা, আদাচাই ও আদাছা এলাকার বিভিন্ন দুর্গম স্থানে তাদের অবস্থান রয়েছে।


বন বিভাগ ও পুলিশ সূত্র জানায়, একসময় সুন্দরবন ছিল জলদস্যু ও বনদস্যুদের অভয়ারণ্য। তাদের দাপটে জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি, এমনকি বনরক্ষীরাও আতঙ্কে দিন কাটাতেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১২ সালে র‌্যাবের নেতৃত্বে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এরপর শুরু হয় সাঁড়াশি অভিযান। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২৩টি অভিযানে ১৩৫ জন দস্যু নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি গ্রেপ্তার হন। ২০১৬ সালের ৩১ মে মাস্টার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক দস্যুমুক্তকরণ কার্যক্রম। পরবর্তী সময়ে ৩২টি বাহিনীর মোট ৩২৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গুলি।


এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করে সরকার। পরে আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা, ঘর নির্মাণ, দোকান, গাভি, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, জাল, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়। মোট ৩২৬টি পরিবার পুনর্বাসন সুবিধা পায়।


বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি উপকূলীয় জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন ও আধুনিক সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তির মাধ্যমে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত কোস্ট গার্ড ৪১টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গুলি, ২৪৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, একটি টেলিস্কোপ ও দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করেছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক এবং জিম্মি থাকা ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।


উপকূলীয় জেলেদের অভিযোগ, চুনকুড়ি, ধানোখালী, মামুন্দো ও মালঞ্চ নদীসহ বিভিন্ন জলপথে মাছ ধরতে গেলে দস্যুদের কবলে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। তারা শুধু ট্রলার লুটেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং মহাজনদের শনাক্ত করে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, অনেক সময় সাধারণ জেলের ছদ্মবেশে নৌকায় উঠে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে বনজীবী ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।


কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা বলেন, সুন্দরবনের অসংখ্য সরু খাল ও ন্যারো চ্যানেল দস্যুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। জোয়ারের সময় যেসব পথে নৌকা চলাচল করে, ভাটার সময় সেগুলোর অনেক অংশ শুকিয়ে যাওয়ায় বড় নৌযান প্রবেশ করতে পারে না। তবে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব দুর্গম এলাকায় নজরদারি চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া অপহরণ বনের ভেতরে ঘটলেও মুক্তিপণের অর্থ অনেক সময় মোংলা, বরগুনা, পাথরঘাটা কিংবা খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাতবদল হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও দস্যুতা প্রতিরোধে কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।


কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বি এন সাব্বির আলম সুজন বলেন, সুন্দরবনের সব দস্যুর বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। সুন্দরবন সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।


কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, ইলিশ আহরণ ও মধু সংগ্রহ মৌসুমে দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ওই সময় বিপুলসংখ্যক বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করেন, আর তাদের লক্ষ্য করেই অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি চালানো হয়। বর্তমানে সরকারের তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বনজীবীদের প্রবেশ সীমিত রয়েছে। ফলে অপহরণ ও মুক্তিপণের ঘটনাও কমেছে। তবে মৌসুম শুরু হলে দস্যুরা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে তারা আগের মতো শক্ত অবস্থান নিতে পারছে না।


তিনি আরও বলেন, কোস্ট গার্ডের অভিযানের মুখে কুখ্যাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে আত্মসমর্পণ করেন। তবে আত্মসমর্পণের পর অনেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না এবং সমাজও তাদের সহজভাবে গ্রহণ করে না। এসব কারণেই কেউ কেউ পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।


তিনি দস্যুদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে মেসবাউল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনের দস্যু সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য কোস্ট গার্ডের জনবল বৃদ্ধি, কৌশলগত স্থানে নতুন স্টেশন ও আউটপোস্ট স্থাপন, দ্রুতগতির স্পিডবোট ও আধুনিক ড্রোন সংযোজন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের টেকসই পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে দীর্ঘমেয়াদে দস্যুমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। তথ্য সূত্র: এশিয়া পোস্ট