ঢাকা অফিস।।
‘যার যায় সে বোঝে’ প্রচলিত প্রবাদ। প্রতিদিন হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যেন কেবল মৃতের সংখ্যা জানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন। নিজেদের ব্যর্থতা, অযোগ্যতাকে আড়াল করতে ‘উপসর্গ’ শব্দটির ব্যবহার করছেন। গত তিন মাসে (১৫ মার্চ থেকে ২৮ জুন) হামে আক্রান্ত হয়ে ৭১২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিদিন গড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় সাতজন। অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। হামে মৃতের সংখ্যা কম দেখাতে চালাকি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর ‘হাম উপসর্গে মৃত্যু’ শব্দটি আমদানি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এর দায় কার? গত ১৫ মার্চ থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ৯৯ হাজার ২০৭। এটি সরকারি হিসাবে, বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। প্রতিদিন হামে শিশু মারা যাচ্ছে অথচ স্বাস্থ্য অধিদফতর র্যাবের ক্রস ফায়ারের পর বিজ্ঞপ্তির মতোই প্রতিদিন প্রেস রিলিজ গণমাধ্যমে পাঠাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাজ কি শুধু মৃতের সংখ্যা জানানো? প্রতিদিন গড়ে হামে সাতজন শিশু মৃতের ভয়াবহ ঘটনা কি স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বিবেকে নাড়া দেয় না? নাকি তিনি কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ওই পদে বসে ‘ক্ষমতা ভোগ’ করছেন?
দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামের সংক্রমণ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য শিশু। কোথাও কোথাও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভন্ন এলাকায় একাধিক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিদিনই মায়ের কোল খালি হচ্ছে। এত এত শিশুর মৃত্যুতেও যেন কানে তুলো দিয়ে বসে আছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। স্বাস্থ্য অধিদফতরে দায়িত্বে যারা, তারা কোনো কাজের কাজ করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের দায়িত্ব নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। তিনি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তার দায়িত্ব তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ভারতের প্রেসক্রিপশনে করছেন তার রুটিন কাজ। দায়িত্ব পালনের জন্য এই পদ দখল করে আছেন। কিন্তু এ দায়িত্ব তার দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নয়। প্রতিদিনই হাম ও উপসর্গে শিশুর মৃত্যু হলেও তার কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। মহাপরিচালক হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদফতরে যোগদানের পর থেকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি কোনো কাজই করেননি এমন অভিযোগ এখন সংশ্লিষ্ট মহলের।City & Local Guides
এদিকে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, আর প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার হারাচ্ছে তাদের আদরের সন্তানকে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে একের পর এক শিশুর মৃত্যু গোটা দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয় বরং টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার এবং জনসচেতনতার মতো একাধিক বিষয়ের সমন্বিত চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। কোথাও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, আবার কোথাও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নজরদারি, টিকাদান কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তারা। কোনো এলাকায় হামের রোগী শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে নজরদারি, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, টিকাদান এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ যথাসময়ে না হলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের নিয়ে চরম উদ্বেগে আছেন অভিভাবকরা। সরকার থেকে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও কার্যকর টিকা এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। শুরুতে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি নিজে থেকেই সেরে গেলেও কিছু শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এসব জটিলতাই মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।News
কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়েছে। আবার কোথাও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। শুরুতে মনে হয়েছিল সাধারণ জ্বর। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু তখন অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে, আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছিল। এরপর কোনো সরকারই ভ্যাকসিন দেয়নি। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়। এছাড়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেয়া হয়ে থাকে। টিকাদান কর্মসূচির কারণে দেশে একসময় হামের প্রকোপ কমে এলেও চলতি বছর তা আবার বেড়েছে। গত ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং ১০ জানুয়ারি সেখানে সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি এলাকাতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হামের উপসর্গে আরো চারজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে নতুন করে উপসর্গ দেখা দিয়েছে এক হাজার ৫৭ জনের মধ্যে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১২ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৯৩ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৬১৯ শিশু মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তদের মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী ১১৬ জন এবং হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৯৪১ জন। এই সময়ে ৮৮৯ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৮৬৫ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৯ হাজার ২০৭, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৭১০। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৮২ হাজার ৮৪৪ রোগী, যাদের মধ্যে ৭৯ হাজার ১৫২ জন ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। এ রোগের প্রধান উপসর্গগুলো হলোÑ অতিরিক্ত জ্বর, সর্দি ও কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া (কনজাংটিভাইটিস), মুখের ভেতরে সাদা দাগ (কপলিক স্পটস), শরীর ও মুখম-লে লাল ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠা। হামের কারণে শিশুদের মারাত্মক ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কানে সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনা মূলত এ কারণেই ঘটে।










































