স্টাফ রিপোর্টার।।
বাগেরহাটের মংলা পোর্ট পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের মাছমারা এলাকায় এক বিধবা নারীর পরিবারে ওপর বর্বরোচিত হামলা, ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় মংলা থানা পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার দীর্ঘ ৫ দিন পর এবং সংবাদমাধ্যমের তীব্র চাপের মুখে গত ২৬ জুন মোংলা থানায় একটি নিয়মিত মামলা (মামলা নং- ২৩) রুজু হলেও এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আসামিরা। রাজনৈতিক প্রভাব ও পুলিশের শিথিলতার কারণে অপরাধীরা গ্রেফতার না হওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি, যার ফলে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে মাছমারা গ্রামের বাসিন্দা নাজমা রায়হানের বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে ৮-১০ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী। স্থানীয় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও মংলা পৌর কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিক তালুকদারের নেতৃত্বে দলটি লাঠিসোঁটা ও লোহার রড নিয়ে ঘরের সামনে এসে নিজেদের ‘পুলিশ’ পরিচয় দিয়ে দরজা খুলতে বলে।
গভীর রাতে দরজা খুলতে সামান্য দেরি হওয়া মাত্রই তারা হিংস্রভাবে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। ঘরে ঢুকেই নাজমা রায়হানের ছেলে শাহিন আহমেদ সানিকে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম করে। এ সময় ঘরে থাকা ভাগ্নি জামাই নুর আলম (৩৫) বাধা দিতে গেলে তাকেও পিটিয়ে হাড়ভাঙা জখম করা হয়। যাওয়ার আগে ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন এবং পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দেয় তারা।

ভয়াবহতার এখানেই শেষ নয়; পুলিশ প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই দিন (২১ জুন) দুপুর আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটের দিকে আসামিরা আবারও ওই অসহায় পরিবারটির ওপর দ্বিতীয় দফায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার ২ নং আসামি তারেক বেপারী বিধবা নারী নাজমা রায়হানের চুলের মুঠি ধরে লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট শুরু করে। এরপর মানিক ও তারেকসহ ১ থেকে ৫ নং আসামি এবং অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা লাঠি ও লোহার রড দিয়ে নাজমা রায়হানের হাত, পা ও তলপেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে এবং তাঁর শ্লীলতাহানি ঘটায়। স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা খুন করার হুমকি দিয়ে বীরদর্পে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরবর্তীতে আহতদের উদ্ধার করে মংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারটি অভিযোগ করেছে, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে তারা সরাসরি মংলা থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে প্রথম দিকে পুলিশ মামলা নিতে চরম গড়িমসি ও অস্বীকৃতি জানায়। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণেই পুলিশ মূলত নীরব ভূমিকা পালন করছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের টনক নড়ে। অবশেষে ঘটনার দীর্ঘ ৫ দিন পর মোংলা থানা পুলিশ মামলাটি নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়। তবে মামলা হলেও আসামিদের গ্রেফাতারে পুলিশের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার প্রধান আসামি মানিক তালুকদার (৪৫) মংলা পৌর কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও এলাকায় তিনি একজন শীর্ষ মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক ও একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি মাদকবিরোধী অভিযানে মানিক তালুকদারের মা তারা বেগম (৭০) ৪৯৫ পিস ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন।

মামলার অন্য পদধারী আসামিরা হলেন- তারেক বেপারী, রিঙ্কু হালদার , রবিউল হাওলাদার ও মাসুম হাওলাদার। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা রাতারাতি খোলস বদলে বিএনপি ও কৃষক দলের বড় বড় পদ বাগিয়ে নিলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারা এলাকার সকল প্রকার অপকর্ম ও চাঁদাবাজির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। দল বদলালেও তাদের চরিত্র বদলায়নি। তাদের এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে এবং পুলিশের রহস্যজনক নমনীয়তায় দলের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন বিএনপির স্থানীয় সাধারণ নেতা-কর্মীরা।
আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও কেন গ্রেফতার হচ্ছে না- এমন প্রশ্নে মংলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, “ভুক্তভোগী নাজমা রায়হানের লিখিত এজাহারের প্রেক্ষিতে পেনাল কোডের ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩৫৪, ৪২৭, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
তবে ওসির এই আশ্বাসকে কেবল ‘কাগুজে কথা’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। একটি বিধবা পরিবারের ওপর এমন নৃশংস হামলার পরও মূল আসামিরা বুক ফুলিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ানোয় মংলার সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ অনতিবিলম্বে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফাতারের জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।










































