শাহ মো. তানভীর আহমেদ।।
জোনাকির আলো হারিয়ে যাওয়া শৈশবের এক ঝিকিমিকি স্মৃতি। গ্রামের নিঃশব্দ আঁধার রাতে হঠাৎ হঠাৎ ঝোপের ফাঁক গলে দেখা যেত ছোট্ট ছোট্ট আলোর বিন্দু। গাছের পাতায়, কাঁশবনে, কিংবা ধানক্ষেতে তারা মিটিমিটি করে জ্বলত। জোনাকি শুধু আলোর পোকাই নয়, যেন আমাদের শৈশবের জাদুর ঝিলিক। বাড়ির উঠোনে সন্ধ্যা নামতেই শুরু হতো সেই আলো খোঁজার অভিযান। হাতে ধরা, আবার ছেড়ে দেওয়া জোনাকির সঙ্গে এক খেলার সম্পর্ক ছিল আমাদের। কারো কারো মনে হতো, জোনাকি বুঝি প্রকৃতির ছোট্ট কোনো প্রদীপ, আবার কেউ কৌতূহলে উল্টেপাল্টে দেখত আলোটা জ্বলে কিভাবে, জোনাকির আলো মানেই শিশুদের চোখে বিস্ময়, আনন্দ আর রূপকথার মতো এক অভিজ্ঞতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে গেয়েছিলেন, ‘ও জোনাকি, কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ/ আঁধার সাঁঝে বনের মাঝে উল্লাসে প্রাণ ঢেলেছ।’ আবার কবি আহসান হাবীব ‘জোনাকিরা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তারা একটি দুটি তিনটি করে এলো/তখন বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া/বইছে এলোমেলো/তারা একটি দুটি তিনটি করে এলো।’
অথচ আজ সেই আলো প্রায় নিভে গেছে।আগের মতো আর দেখা যায় না ঝোপে-জঙ্গলে জোনাকির নৃত্য।
জোনাকি পোকার আলো আবিষ্কারের ইতিহাস খুবই পুরোনো। ফরাসি নাগরিক রেনে আন্তোইন ফেরচল্ট ডি রেউমুর প্রথম এই পোকার আলোর রহস্য উন্মোচন করেছেন। তিনি ১৭২৯ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। যেখানে জোনাকি পোকার আলোর রাসায়নিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছেন। জোনাকির দেহে লুসিফেরিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এই লুসিফেরিন অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আলো উৎপন্ন করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স। আর বিশেষ প্রক্রিয়ায় জোনাকি পোকা অক্সিজেনের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যা মূলত মিট মিট করে আলো জ্বালার পেছনে ভূমিকা রাখে। অক্সিজেন সরবরাহের ওপর নির্ভর করে থাকে কখন আলো জ্বলবে এবং নিভবে। এরা যখন অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তখন আলো নিভে যায় এবং অক্সিজেন সরবরাহ করলে বিক্রিয়া শুরু হয়ে আলো জ্বলে ওঠে।
পরিবেশ বদলে যাচ্ছে, রসায়নের ছোঁয়ায় পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতি। জোনাকির বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ আমরা রাখতে পারছি না।জোনাকির হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি পোকা নয়, মানে হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো শৈশব। ঝিকিমিকি সেই আলো আজ কেবলই স্মৃতির পাতায়।জোনাকিসহ কিছু পোকামাকড় আছে, যারা আলোর জন্য বিখ্যাত। এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় বায়োলুমিনেসেন্স বা জৈব আলোকধারা। বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি রয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে-সব জোনাকিই আলো দেয় না। প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকি ছাড়াও জোনাকির লার্ভা এমনকি ডিম থেকেও আলো উৎপন্ন হতে দেখা যায়। এটি তাদের একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। জোনাকির আলো পৃথিবীর অন্যতম কার্যকর আলো।
কারণ এ আলোর পুরোটাই আলোকশক্তি। জোনাকি পোকাকে ইংরেজিতে বলে লাইটিং বাগ বা ফায়ার ফ্লাই। ছোট্ট কালচে বাদামি রঙের এই পোকা দেখতে অনেকটা লম্বাটে গড়নের হয়ে থাকে। লম্বায় প্রায় দুই সেন্টিমিটার, এজন্য বিজ্ঞানীরা জোনাকির আলোকে কোল্ড লাইট বা শীতল আলো বলে অভিহিত করেন, জোনাকির লার্ভা সাধারণত ছোট শামুক ও কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে।জোনাকির জীবনচক্রেও আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রজননের সময় তারা আলো ব্যবহার করে সঙ্গীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিছু কিছু প্রজাতিতে শুধু পুরুষ বা শুধু স্ত্রী জোনাকি আলো দেয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উভয়েরই এই ক্ষমতা থাকে। আলো শুধু প্রজননের জন্য নয়-যোগাযোগ এবং শিকারীকে সতর্ক করতেও ব্যবহৃত হয়।
রাতের নিস্তব্ধতা, কুয়াশায় ঢাকা আকাশ, দূরের ঝোপঝাড় বা বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর ঘাস-পাতার ফাঁকে জ্বলে ওঠা জোনাকির আলো একসময় গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা দৃশ্য ছিল। বিশেষ করে বর্ষা ও শরৎকালের রাতে জোনাকির আলো বেশি দেখা যেত। শিশুদের খেলার সঙ্গী হয়ে উঠত এই পোকা। দল বেঁধে ছুটতে ছুটতে তারা জোনাকি ধরার মজায় মেতে উঠত। তবে শুধু শিশুরাই নয় প্রকৃতিপ্রেমী সব বয়সী মানুষের মন ছুঁয়ে যেত সেই অসাধারণ আলো।
কিন্তু এখন, রাত আসে ঠিকই, অন্ধকারও নামে আগের মতো, তবে সেই চেনা ঝিকিমিকি আলো আর তেমন চোখে পড়ে না। যদিও কোথাও কোথাও দেখা যায়, তবে তা খুবই সীমিত। জোনাকির আলো যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের রাতের প্রকৃতি থেকে- নিভে যাচ্ছে একটুকরো শৈশব, নিভে যাচ্ছে প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য।
বিজ্ঞান সাময়িকী বায়োসায়েন্স প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষক দলের প্রধান টাফটস ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস সিএনএনকে বলেন, নগরায়ণের প্রভাবে অনেক প্রাণী প্রজাতিই নিজেদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে তাদের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাতির জোনাকিও আছে, যাদের জীবনচক্র পুরো করার জন্য আশপাশের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
যেমন মালয়েশিয়াতে এক প্রজাতির জোনাকি আছে, যারা প্রজনন ঘটনায় ম্যানগ্রোভ গাছগাছালির এলাকায়। কিন্তু পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বাদাবনগুলো সব পাম তেলের কারখানা আর মাছের খামারে পরিণত হচ্ছে। ঐ জোনাকি প্রজাতির টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। জোনাকির জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হুমকি হয়ে উঠেছে রাতের বেলায় কৃত্রিম আলো। গত ১০০ বছরে নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বেড়েছে গুণাত্মক হারে। আর এত আলোর অত্যাচারে জোনাকির বংশ বিস্তার করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্য সব দেশীয় প্রতিবেদন থেকে যানা যায়, কেন জোনাকির আলো হারিয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
তিনি বলেন, জোনাকি পোকা দিনদিন কমে আসার পেছনে প্রধানত দুইটি কারণ দায়ী। প্রথমত মাত্রা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা। আমরা জোনাকি পোকা সাধারণত রাতে দেখতে পাই কিন্তু এরা দিনের বেলাতেও থাকে। রাতের অন্ধকারে তাদের আলো আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয়, তাই আমরা ভাবি তারা শুধু রাতেই থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তারা দিনেও একইভাবে আমাদের আশপাশে থাকে। ফসলের ক্ষেতে অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা দমনের জন্য যখন আমরা মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করি, তখন সেই রাসায়নিক পদার্থ জোনাকি পোকার ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে এদের জীবনচক্র থেমে যায় বা এরা মারা যায়।
অধ্যাপক ড.মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ আরও বলেন, দ্বিতীয়ত জোনাকির বসবাসের জন্য যে বাসস্থান দরকার বা যেই পরিবেশ দরকার তা আমরা নানা কারণে ধ্বংস করছি। যেমন বন জঙ্গল উজার করে বাড়িঘর নির্মাণ, পরিবেশ ধ্বংস করে বসতি স্থাপন করা। আমাদের ক্যাম্পাসেও বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্প বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আমরা ঝোপঝাড় ধ্বংস করি। ফলে তাদের বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যায় এবং এটা তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসার অন্যতম প্রধান কারণ।
জোনাকিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কিছু দিক চিহ্নিত করা হয়েছে-
বন ধ্বংস
জোনাকি সাধারণত গাছপালা ঘেরা, আর্দ্র ও ছায়াঘেরা পরিবেশে বাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু ক্রমাগত নগরায়ন, বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট ও প্রকৃতির নিঃসঙ্গতা-সব মিলে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু তারা নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকে থাকতে অভ্যস্ত, তাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে তারাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
কীটনাশকের ব্যবহার
আধুনিক কৃষিতে ফসল রক্ষায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকা নয়, উপকারী অনেক প্রজাতিরও মৃত্যু ডেকে আনছে। জোনাকির লার্ভা সাধারণত মাটির নিচে বাস করে এবং ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু যখন সেই মাটি বিষাক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। বিষাক্ত জমিতে জোনাকির ভবিষ্যৎও আজ অনিশ্চিত।
কৃত্রিম আলোর দখলে প্রকৃতি
শহরের তো বটেই, বর্তমানে গ্রামেও রাত আর আগের মতো ঘন অন্ধকারে ঢাকা থাকে না। বৈদ্যুতিক আলো, স্ট্রিটলাইট, বিলবোর্ড কিংবা ঘরের বাহারি আলোকসজ্জা- সবকিছু মিলিয়ে রাতের আকাশও যেন হারিয়ে ফেলেছে তার নিজস্ব রূপ। অথচ জোনাকিরা প্রাকৃতিক অন্ধকারে আলো দিয়ে সঙ্গী খুঁজে নেয়। কিন্তু কৃত্রিম আলোয় তারা বিভ্রান্ত হয়, ফলে তারা স্বাভাবিক প্রজনন করতে পারে না। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমে আসছে।
আবহাওয়া পরিবর্তন
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু মানুষের জন্যই নয়, ছোট ছোট জীবজগতের জন্যও এক বিশাল হুমকি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মৌসুমি পরিবর্তনের ব্যতিক্রমতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত-এসব কারণে অনেক অঞ্চলে জোনাকির অনুকূল পরিবেশ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এক বৈশ্বিক সমস্যা, যার প্রভাব পড়ছে সবখানে, এমনকি এই ক্ষুদ্র কিন্তু অপার বিস্ময় জোনাকির জীবনেও।
ব্যাবসায়িক কাজে জোনাকি সংগ্রহ
কিছু কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে জোনাকি সংগ্রহ করে থাকে, যা বেশকিছু দেশে জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিগমা কেমিক্যাল কোম্পানি জোনাকি থেকে লুসিফেরেস ও লুসিফেরিন (যা থেকে আলো উৎপন্ন হয়) সংগ্রহের জন্য তিন মিলিয়নেরও বেশি জোনাকি সংগ্রহ করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চীনে থিম পার্ক এক্সিবিশন এবং রোমান্টিক উপহার তৈরির জন্য কয়েক মিলিয়ন জোনাকি সংগ্রহ ও বিক্রি করা হয়েছে। যদিও আন্দোলনের মুখে চীনে এখন ব্যাবসায়িক কাজে জোনাকি সংগ্রহ বেশ কমে এসেছে।
জোনাকি শুধু একটি ক্ষুদ্র পোকা নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির এক অপূর্ব নিসর্গিক অলংকার। তার আলো রাতের গভীর অন্ধকারে ছড়িয়ে দেয় এক শান্তিময় সৌন্দর্য, যা আমাদের মনে জাগায় মুগ্ধতা ও প্রশান্তি। জোনাকির হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, বরং প্রকৃতির ভারসাম্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশের বিলুপ্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, কীটনাশকের সচেতন ব্যবহার, বনাঞ্চল ও জলাভূমির সুরক্ষা এবং প্রাণিকুলের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব গড়ে তোলার মাধ্যমে আবার ফিরিয়ে আনতে পারি জোনাকির সেই হারিয়ে যাওয়া আলো এবং প্রকৃতিকে দিতে পারি তার হারানো সৌন্দর্যের এক ঝলক।









































