Home Lead দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জুড়ে নিয়ন্ত্রণহীন লক্কর ঝক্কর পরিবহন

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জুড়ে নিয়ন্ত্রণহীন লক্কর ঝক্কর পরিবহন

43


সৈয়দ রানা কবীর
কয়েক দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না লক্কড় ঝক্কড় যানবাহন। বর্তমানে এ সকল যানবাহনে সয়লাব দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক-মহাসড়ক জুড়ে। সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরাতে পাচ্ছে না সরকার। শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই নয়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারও পারেনি এসব যানবাহন সরাতে। সর্বশেষ সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের মে মাসেও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরানোর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু তা আর আলোর মুখ দেখেনি বা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, সকল শ্রেণি যানবাহন চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাসিক চুক্তিতে। সড়কে ফিরছে না কাঙ্খিত নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা।
একাধিক সুত্রে জানাগেছে, গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে নানা সময়ে পুরনো বাস-ট্রাক উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও আটকে দেন তৎকালীন প্রভাবশালী পরিবহন নেতা শাহাজাহান খান। পরে ধর্মঘটসহ নানা আন্দোলনের ফলে সড়ক পরিবহন আইন আর কার্যকর করা যায়নি বছরগুলোতেও। সম্প্রতি এমনি এক ধর্মঘটের হুমকির সিদ্ধান্ত সরকার বিবেচনা করার শর্তে মালিক- শ্রমিক সংগঠন তাদের সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে। অন্তর্র্বতী সরকারও একই রকম ধারায় এবং বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রজ্ঞাপন দিয়ে, ঘোষণা দিয়েও বাস্তবায়ন করতে পারছেনা মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ কার্যক্রম। অথচ ইকোনমিক লাইফ বাড়ানোসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হন পরিবহন নেতারা। আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে নানা দাবি, দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশে ধর্মঘটের হুমকির মুখে বার বার সরকার পরিবহন মালিকদের দাবির মুখে নত শিকার করতে বাধ্য হচ্ছে। বার বার একই বাধার সম্মুখীন হচ্ছে সরকার। আর বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও যাত্রীরা।
এদিকে পরিবহন মালিকদের দাবি উত্থাপন, ধর্মঘটের হুমকি ও সরকারের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাসের কড়া সমালোচনা করেছেন সড়ক ও পরিবহন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। গত ১০ আগস্ট বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের অনুগত পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পুরনো কায়দায় দেশের মানুষকে জিম্মি করে কথায় কথায় অযৌক্তিক দাবি আদায়ে পরিবহন ধর্মঘট জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করা উচিত।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, সরকারকে জিম্মি করে কিছু আদায় করা উচিত নয়। সরকারের সব সিদ্ধান্ত আইনানুগভাবে বাস্তবায়ন হবে। অবৈধ বা অচল গাড়ি চলুক, সেটাও আমরা চাই না। তবে সড়ক আইন পুরোপুরি প্রয়োগ করলে একবারে ৮০ শতাংশ গাড়ি সড়ক থেকে উঠে যাবে। পুরনো গাড়ি বদলে নতুন গাড়ি আনতে কিছু সময় প্রয়োজন, সেই সময় আমাদের দিতে হবে। কিন্তু বিগত ২০ বছর যাবত তাদের সেই সময় হয়ে উঠেনি বলে অভিমত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলন পরবর্তীতে অন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ‘যানজট ও বায়ুদূষণ’ নিরসনে পুরনো যানবাহন উঠিয়ে দেয়াসহ পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে দুই দফা বৈঠক করে দু’টি সিদ্ধান্ত নেয়। একটি হলো- ছয় মাস পর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া যানবাহনের নিবন্ধন বাতিল করে সড়ক থেকে প্রত্যাহার এবং সেগুলো ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়ে ধ্বংস করে দিতে হবে। কিন্তু সেই সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়ক থেকে কোনোভাবেই সরানো যায়নি মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনগুলো।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন, সেতু ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বারবার নির্দেশনা দিয়েও সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন না সরানোর একটি কারণ হচ্ছে পরিবহন মালিকদের অনীহা। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয় মালিকরা যাতে এই লক্কর ঝক্কর যানবাহন গুলো তারা নিজ উদ্যোগে সড়ক থেকে উঠিয়ে নেন। কিন্তু তাতেও কোন কর্নপাত করছেনা পরিবহন মালিকরা। ফলে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না সরকার।
সুত্র জানায়, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে, দুর্ঘটনা কমাতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। শিগগির তা বাস্তবায়ন করা হবে। এই ছোট দেশ, জমির স্বল্পতা আছে। তাই কম ভূমি ব্যবহার করে কীভাবে টেকসই উন্নয়ন করা যায়, সেই বিষয়ে একটা মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।
সাধারণ মানুষ ও নাগরিক নেতারা বলেন, পরিবহন খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। তারা সবসময় সংশ্লিষ্ট ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তারা বলেন, পরিবহন নেতাদের ক্ষমতা এতই প্রকট যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়তোবা এ ক্ষমতার কাছে অনেকটা জিম্মি দশার মধ্যে পড়ে সিদ্ধান্ত বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এর আরেকটা কারণ আছে, বাংলাদেশের পরিবহন খাতের অপসংস্কৃতি হচ্ছে, তাদের স্বার্থ হাসিল না হলে এবং তাদের কিছু অনৈতিক দাবি-দাওয়া সরকার না মানলেই পরিবহন ধর্মঘট হুমকিদেয় এবং কখনো কখনো শুরু করে ধর্মঘট। ফলে জনগণ ও সরকারকে জিম্মি রেখে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা তাদের অনৈতিক ও অযৌক্তিক দাবিগুলো আদায় করে নেয়।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিগত সরকারের সময় থেকে পরিবহন মালিকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বেড়ে গেছে। অন্তর্র্বতীকালীন সরকারও সে পদাংক অনুসরণ করছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, সিটিং সার্ভিস বাসগুলো সম্পূর্ণভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে। কিন্তু আমাদের দেশে ৯৯ শতাংশ বাসের মালিক বেসরকারি। ফলে সরকার এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বাস মালিকরা।
অপরদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, যানবাহন মালিকরা যখন তাদের গাড়ির নিবন্ধন ও রুট পারমিট নেয়, তখনই তারা ইকোনমিক লাইফের বিষয়টি মেনেই নিয়েছিল। এখন তারা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক দাবি। যেহেতু সরকারের পরিবহন সক্ষমতা নেই, তাই যানবাহন মালিকরা হুমকি দিচ্ছে তারা ধর্মঘট করবে, তারা ধর্মঘট করলে সরকার তাদের দাবি মেনে নেবে; নিচ্ছেও। বিষয়টি সমাধান করতে বিআরটিসি’র সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে তিনি দাবি করেন।
অপরদিকে গত ২৭ে জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যিক মোটরযানের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ ও ২৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করাসহ আট দফা দাবি জানায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এসব দাবি মানতে সরকারকে সময় বেঁধে দেয় সংগঠনটি। এ সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে ১২ আগস্ট থেকে দেশ জুড়ে ৭২ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দেয় তারা। পরে ১০ আগস্ট ওই ৮দফা দাবি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন পরিবহন মালিকরা। বৈঠকে পরিবহন মালিকদের সব দাবি মেনে নেয়াসহ সমাধানের প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস দেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেই লক্কর ঝক্কর যানবাহন গুলো এখন রং চং করে দেদারসে চলাচল করছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। হচ্ছে না এর কোন প্রতিকার। কারণ হিসাবে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাসিক চুক্তিতে সড়কে চলাচল করছে সকল শ্রেণির যানবাহন। তাই দ্রুত এসব বিষয়ে প্রতিকার করা উচিত।