সাবজাল হোসেন,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
দিনে কিংবা রাতে দেশের দক্ষিণাঞ্চালের ওপর দিয়ে বিগত কয়েকদিন বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জেও এর কমতি নেই। কেননা সময় যত পার হচ্ছে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। ক্রমেই নীচে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। বাড়ছে বৈশি^ক উঞ্চতা। তাপমাত্রা ক্রমবৃদ্ধির কারনে প্রভাব পড়ছে প্রাণীকুলে। প্রকৃতি যেন ক্রমেই রুক্ষ আর রুষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্ত ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের সরকারী নলডাঙ্গা ভূষন হাইস্কুল সড়কটি যেন বেশ ব্যতিক্রম। কারন এ সড়কের পাশ ঘেষে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অতিপ্রাচীন শতবর্ষী বেশ কিছু রেন্ট্রি কড়াই গাছ।
যেগুলোর ঘন ছায়ায় বেশ শীতল করে রেখেছে সড়কটির আশপাশ। তাই প্রচন্ড গরমে যখন প্রাণীকুল হাফিয়ে ওঠে। তখন শহরের রিকসা ভ্যান চালক, শ্রমজীবি, পথচারীসহ সব শ্রেণীর মানুষের ভীড় জমে থাকে এ এলাকা জুড়েই। তারা পাশের শতবর্ষী গাছগুলো ঘেষে ফাঁকা জায়গায় গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকান পাটের সুশীতল ছায়ায় বসে মন ভরে বিশ্রাম নেন। দিনে কিংবা রাতে ভ্যাপসা গরমে এ সড়কটিই যেন তাদের একমাত্র স্বস্তির ঠিকানা।
সরেজমিনে কালীগঞ্জ শহরের সরকারী নলডাঙ্গা ভূষন হাইস্কুল সড়কটি ঘুরে দেখা গেছে, বৈশাখীর মোড় থেকে ডাকবাংলার মোড় পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটারের অধিক সড়ক। একপাশ দিয়ে প্রাচীন ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ৪৩ টি শতবর্ষী বৃহদ আকারের রেন্ট্রি কড়াই গাছ। যেগুলোর ছায়ায় বেশ শীতল হয়ে রয়েছে সড়কটি। এর পাশ দিয়ে গড়ে উঠেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শহরের একপাশে তাই পরিবেশগত কারনেই কালীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হলুদ ও ভূষিমালের হাট ছাড়াও আড়তগুলো গড়ে ওঠেছে এ সড়কটি ঘেষে। বসবাসের জন্য গড়ে উঠেছে নানা ডিজাইনের ঘরবাড়ি।
তথ্যানুন্ধানে জানাগেছে, এক সময়কার নড়াইলে বসবাসরত জমিদার কালীবাবুর মা কয়েকশ বছর আগে ভারতের কাশিপুর তীর্থ যাত্রা করেন। পথে অতিরিক্ত রোদের তাপ থাকায় সে সময় তার মায়ের আদেশে জমিদার ভারতের পাইকপাড়া থেকে নড়াইল, যশোর থেকে ঝিনাইদহ এবং ঝিনাইদহ থেকে চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত সড়কে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এলাকায় রেইনট্রি বৃক্ষ রোপণ করা হয়। শতবর্ষী অসংখ্য গাছগুলো শত বছর ধরে মহাসড়কের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
সড়ক বিভাগ বলছে, ঝিনাইদহ থেকে যশোরের চাঁচড়া পর্যন্ত প্রায় ৪৮.৫ কিলোমিটার রাস্তা ছয়লেনের কাজ চলছে। সড়কের প্রতি কিলোমিটার রাস্তার সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। রাস্তা যেহেতু বর্ধিত হচ্ছে সে কারনে সড়কের দু’পাশের শতবর্ষী সব গাছ কাটতে হয়েছে। গাছ যেমন পরিবেশের জন্য উপকারী তেমনি মানুষের প্রয়োজনে সড়কটির বর্ধিতকরন জরুরী। ফলে গাছ কাটতে হয়েছে। আধুনিক উন্নত সড়ক হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগবে নাগরিক জীবনে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইন্দাদুল হক সাগর জানান, এমন বৃহদ আকারের গাছ এখন সচারাচর দেখা যায় না। এক সময় ঝিনাইদহ -যশোর মহাসড়কের এবং আশপাশের যশোর বেনাপোল সড়কের পাশ দিয়ে অসংখ্য এমন প্রাচীন গাছ ছিল কিন্ত সম্প্রতি সড়ক বর্ধিতকরণ অর্থাৎ ছয় লেনের রাস্তা নির্মানের জন্য সরকারীভাবে সেগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। এ অঞ্চলে এখন শুধু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালীগঞ্জ শহরের ভূষন সড়কের এ গাছগুলো। তাদের অভিযোগ এর আগে কয়েক দফা ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে শুকনো ডাল কাটার অনুমতি নিয়ে প্রভাবশালীরা অনেক মোটা মোটা কাঁচা ডাল কেটে পকেট ভরেছেন। তাদের দাবি এ গাছগুলো কালীগঞ্জের ঐতিহ্য রক্ষা করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে তাই সঠিকভাবে সংরক্ষন করা জরুরী।
জাপানভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান বলেন, আমি যতটুকু জানি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং ভারতে কিছু এলাকায় এ ধরনের রেইনট্রি গাছ দেখা যায়। এছাড়া দেশের আর কোথায় এরকম বর্ষীয়ান গাছ দেখা যায় না। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ আমাদের পরম বন্ধু। তাই কালীগঞ্জ ভূষন হাইস্কুল সড়কের যে গাছগুলো এখনও মাথা তুলে প্রাণীকুলকে সেবা দিয়ে চলেছে এগুলোর ঐতিহ্য রক্ষায় এবং সংরক্ষনে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।








































