পবিত্র রমজানের অপেক্ষা
সৈয়দ রানা কবীর।।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। এই মাসকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বরাবরের মতোই শুরু হয়েছে মানুষের প্রস্তুতি। রোজার আগে বাজারের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন অনেকেই। সবকিছু আগের মতো হলেও এবছর বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রতিবছর রোজা শুরুর আগেই বাজারে খেজুর, চিনি, ছোলা বেসনের মতো পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এবার এই পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি। আর এই পণ্যগুলোর দাম কিছুটা বৃদ্ধি পলেও স্বস্তি প্রকাশ করেছে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষই। বিক্রেতারা স্বস্তি প্রকাশ করে বলছেন, দাম নাগালের মধ্যে থাকায় ক্রেতাদের কেনাকাটার চাহিদা আছে। যা বিক্রেতাদের জন্য ভালো।
রমজান-সংশ্লিষ্ট এসব নিত্যপণ্যের দাম না বাড়লেও এরইমধ্যে শসা, লেবু ও বেগুনসহ সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। খুলনার আশপাশ এলাকার কয়েকটি কাঁচাবাজারে ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর রমজান মাসকে কেন্দ্র করে রোজা শুরুর আগেই বাজার উত্তপ্ত থাকে। বাড়তে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য থাকে খেঁজুর, শসা, লেবু, বেগুন, ছোলা, ডাল, বেসনের মতো পণ্য। সে হিসেবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন।
বাজারে দেখা যায়, মানভেদে প্রতি কেজি বাংলা খেজুর ১৮০- ২০০ টাকা, মেডজুল খেজুর ১২০০- ১৬০০ টাকা, আজোয়া খেজুর ৯০০-১৩০০ টাকা, কামরাঙা মরিয়ম খেজুর ৭০০-১৮৫০ টাকা, মরিয়ম খেজুর ৬০০ টাকা, তিউনেশিয়ার খেজুর ৪৫০ টাকা, কাঁচা খেজুর ৬০০ টাকা, মাশারুক ৭০০-৯০০ টাকা, সুগাই জাতের খেজুর ৯৫০ টাকা, দাবাস খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৪৬০- ৫০০ টাকা, জাহিদি ২০০- ৩০০ টাকা এবং বরই খেজুর ৪৫০-৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
খেজুর বিক্রেতা আবুল কালাম বলেন, খেজুরের দাম এবছর অনেক কম। যে খেজুর গত বছর ১ হাজার টাকা বিক্রি করেছি সেটা এবার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করছি।
আরেক বিক্রেতা মো. মাহাফুজ বলেন, এবার খেজুরের দাম কমেছে। আর আগে যে-রকম রোজা আসলেই দাম বেড়ে যেতো এবার সেরকম দাম বাড়েনি। আশা করি, দাম আর বাড়বেও না।
এসময় মো. আমিন উদদীন নামের এক ক্রেতা খেজুরের দাম নিয়ে বলেন, খেজুর তো আসলে অনেক রকমের আছে। একেক খেজুরের একেক দাম। যে যার সাধ্য অনুযায়ী কেনে। এবারের ব্যাপারটা কিন্তু আলাদা। আলাদা হচ্ছে এইভাবে, আগের বছরগুলোতে আমাদের মিনিমাম দামের খেজুর কিনতে হয়েছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। এবার আমরা ২০০ টাকাতেও কিনতে পারছি। এক্ষেত্রে আমার কাছে মনে হচ্ছে, খেজুরের দাম নাগালের মধ্যেই আছে।
উল্লেখ্য, এ দিকে এনবিআরের পক্ষ থেকে রমজান মাসে খেজুরকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য খেজুর আমদানির ওপর বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং বিদ্যমান ৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে অর্থাৎ মোট করহার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৮ দশমিক ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর এনবিআরের এই সিদ্ধান্তের ফলেই খুচরা বাজারে কমেছে খেজুরের দাম।
রোজাকে কেন্দ্র করে খেজুরের দাম না বাড়লেও বেড়েছে শসা, লেবু, বেগুনের দাম। এগুলোর মধ্যে লেবুর দাম বেড়েছে দ্বিগুণ হারে। এছাড়াও বাজারে আজকে কয়েকটি সবজি বাদে প্রায় সব সবজির দাম রয়েছে বাড়ন্ত পর্যায়ে।
বাজারে প্রতি কেজি টক টমেটো ২০ টাকা, দেশি গাজর ৩০ টাকা, শিম ৪০-৫০ টাকা, লম্বা বেগুন ৬০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ৬০ টাকা, কালো গোল বেগুন ৭০ টাকা, শসা ৪০-৬০ টাকা, উচ্ছে ৮০টাকা, করলা ১০০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, মূলা ২০ টাকা, লাল মূলা ২০ টাকা, শালগম ২০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ টাকা, পটল ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, ধুন্দল ৬০ ৬০ টাকা, ঝিঙা ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, পেঁয়াজকলি ৪০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা, ধনেপাতা ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৫০ টাকা, ফুলকপি ৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি কাঁচা কলা ২৫ টাকা, হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা করে।
এক্ষেত্রে আজকে থেকে এক মাস আগের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রতি কেজিতে টক টমেটোর দাম কমেছে ১০ টাকা, দেশি গাজরের দাম কমেছে ১০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজিতে লম্বা বেগুনের দাম বেড়েছে ২০ টাকা, সাদা গোল বেগুনের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, কালো গোল বেগুনের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, শসার দাম বেড়েছে ১০-২০ টাকা, শিমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, উচ্ছের দাম বেড়েছে ২০ টাকা, করলার দাম বেড়েছে ৩০ টাকা, শালগমের দাম বেড়েছে ১০ টাকা, ঢেঁড়সের দাম বেড়েছে ৩০ টাকা, পটলের দাম বেড়েছে ৭০ টাকা, চিচিঙ্গার দাম বেড়েছে ১০ টাকা, বরবটির দাম বেড়েছে ১০ টাকা, পেঁয়াজকলির দাম বেড়েছে ২০ টাকা, কচুর লতির দাম বেড়েছে ৪০ টাকা, কচুরমুখীর দাম বেড়েছে ২০ টাকা, কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে ২০ টাকা, ধনেপাতার দাম বেড়েছে ৭০ টাকা। আর প্রতি পিসে ফুলকপির দাম বেড়েছে ২০ টাকা, চাল কুমড়ার দাম বেড়েছে ১০ টাকা। আর প্রতি হালিতে লেবুর দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সবজির দাম রয়েছে অপরিবর্তিত।
সবজির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ জানিয়ে বিক্রেতা মো. রহিম বলেন, সবজির দাম যে রোজার কারণে বেড়েছে এমন না। এখন আসলে শীত শেষ হয়েছে, এই সিজনের সবজি শেষের দিকে। তাই সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। আবার নতুন সিজনের সবজি আসছে সেগুলোরও দাম বেশি, যেহেতু সেগুলো নতুন। তাই এই মাঝামাঝি সময়ে সবজির দাম কিছুটা বাড়তি।
এদিকে সবজির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বাজার করতে আসা ক্রেতারা। মাহফুজুর রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, সবজির দাম কিন্তু অনেকটা নীরবেই বেড়ে গেলো। খুব যে বেড়েছে সেটা বলা যাবে না; মানে নাগালের বাইরে বলা যাবে না। কিন্তু বেড়েছে। এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নাহলে রোজায় এগুলো আমাদের আবার ভোগাবে।
সবজির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে আরেক ক্রেতা ইয়াসিন হোসেন বলেন, এখনই যদি এমন হয়, তাহলে তো রোজায় মনে হচ্ছে আরও খারাপ হবে দামের অবস্থা। যে দাম আছে সেগুলো এখনও সহনীয়। এর বেশি যাতে না হয়, সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে।
গত এক মাসের ব্যবধানে এখনও স্বস্তি ফেরেনি মাংসের বাজারে। বরং বেড়েছে গরু ও খাসির মাংসসহ মুরগির মাংসের দাম।
আজকে বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা এবং খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১০০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া আজকে ওজন অনুযায়ী, ব্রয়লার মুরগি ১৯৫- ২১০ টাকা, কক মুরগি ২৫০-২৮০ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩০০ টাকা, দেশি মুরগি ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন লাল ডিম ১০০ টাকা, সাদা ডিম ১১০ টাকা।
এক্ষেত্রে দেখা যায় এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে গরুর মাংসের বেড়েছে ২০ টাকা, খাসির মাংসের দাম বেড়েছে ৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ৪-১০ টাকা, লেয়ার মুরগির দাম বেড়েছে ১০-১২ টাকা এবং দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। এদিকে কক মুরগির দাম কমেছে ২০-৩৫ টাকা। এছাড়া প্রতি ডজনে সব ধরনের ডিমের দাম কমেছে ১০ টাকা।
খুলনার চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. বাতেন বলেন, এখন একটু দাম বাড়তি আছে। গত সপ্তাহে আরও কম ছিল। সব ধরনের মুরগির দামই কেজিতে প্রায় ১০ টাকা করে কম ছিল। তবে এখন যে দাম সেটা মোটামুটি ১০ রোজা পর্যন্ত থাকবে সেটা বলা যায়।
এছাড়া বাজারে আকার ও ওজন অনুযায়ী ইলিশ মাছ ১০০০-২০০০ টাকা, রুই মাছ ২৮০- ৪০০ টাকা, কাতল মাছ ৩০০-৪০০ টাকা, কালিবাউশ ৪০০-৫০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৮০০-১৬০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৪০০ টাকা, কৈ মাছ ২০০-১০০০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০-১২০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০-১০০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৫০০-১০০০ টাকা, শোল মাছ ৬০০-৮০০ টাকা, মেনি মাছ ৬০০ টাকা, চিতল মাছ ৭০০-১০০০ টাকা, সরপুঁটি মাছ ২৫০-৪০০ টাকা, রূপচাঁদা মাছ ৮০০-১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য সময় রমজান মাস শুরুর আগেই বেসন, ডাল, ছোলা, চিনির মতো মুদি পণ্যের দাম বাড়তে থাকলেও এবার কিন্তু এখনো তেমন কিছু ঘটেনি। এখনও এসব পণ্যসহ অন্যান্য মুদি পণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। তবে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সয়াবিন তেল। সয়াবিন তেলের সংকটে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বরাবরের মতো ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়পক্ষেরই অভিযোগ তারা তেল পাচ্ছেন না। বিক্রেতারা বলছেন, তারা বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। আর ক্রেতারা বলছেন, তাদের তেলের জন্য প্রতিনিয়ত ঘুরতে হচ্ছে এ দোকান থেকে সে দোকানে। আবার শুধু তেল তারা কিনতে পারছেন না, সঙ্গে নিতে হচ্ছে অন্যান্য পণ্য। কাসেম জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা মামুন বলেন, গত সপ্তাহে চার কার্টন তেলের সাথে এক বস্তা পোলাওয়ের চাল দেওয়ার কথা। চাল বাধ্যতামূলক নিতে হয়েছিল। কিন্তু এখনও মালই দেয় নাই। আমি তো তাদের কথা মতোই অর্ডার করলাম তাও মাল পাই না। সোজা কথা আমরা তেল পাচ্ছি না।
খায়ের জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা মো. করিম বলেন, তিন কার্টন তেলের সঙ্গে আমাকে এক বস্তা পোলাওয়ের চাল নিতে হয়েছে। তাও তেল পাই না।
ইমতিয়াজ হেসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, সয়াবিন তেলের জন্য আমাদের নিয়মিতই ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। তেলের জন্য আমাদের এই দোকান থেকে সেই দোকানে দৌড়াতে হয়। কেউ শুধু তেল বিক্রি করে কেউ করে না। এটার জন্য আমাদের ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। সবসময় কি মানুষের অন্য মালামাল কিনতে হবে? এটা কেমন কথা?
বাজারে প্রতি কেজি বুটের বেসন ১২০ টাকা, অ্যাংকর বেসন ৮০-৯০ টাকা, ছোট মসুরের ডাল ১২৫ টাকা, মোটা মসুরের ডাল ১০০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৩০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৫০ টাকা, খেসারি ডাল ১০০ টাকা, বুটের ডাল ১১০ টাকা, মাশকলাইয়ের ডাল ১৭০ টাকা, ডাবলি ৬০ টাকা, ছোলা ১০০ টাকা, প্যাকেট পোলাওয়ের চাল ১৩০ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চাল মান ভেদে ১১০-১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৫৭ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১২৫ টাকা, খোলা চিনি ১২০ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৫০ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১১৫ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এক্ষেত্রে দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে বুটের ডালের দাম কমেছে ১৫ টাকা, ডাবলির দাম কমেছে ১০ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চালের (মান ভেদে) দাম কমেছে ১০ টাকা, খোলা চিনির দাম কমেছে ৫ টাকা। এছাড়া অন্য কোনও পণ্যের দাম বাড়েনি, রয়েছে আগের মত।











































