Home Lead কুয়েট রণক্ষেত্র : সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

কুয়েট রণক্ষেত্র : সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

18


ফরম বিতরণকালে ছাত্রদলের ওপর হামলার অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার।।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দফায় দফায় এ সংঘর্ষ চলে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।
ছাত্রদল নেতারা অভিযোগ করেছে, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারকে অপব্যবহার করে ফরম বিতরণের অভিযোগ এনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে গুপ্ত সংগঠন শিবির ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কতিপয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী। বৈষম্যবিরোধীদের ব্যানারে বের করা মিছিল থেকে প্রথমে আক্রমণ করা হয়।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা।
ক্যাম্পাস সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানান, কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুয়েট শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছিল। সোমবার তারা ক্যাম্পাস এলাকায় লিফলেট বিতরণ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করেন। এ সময় তাঁরা ‘ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা, এই কুয়েটে হবে না’, ‘দাবি মোদের একটাই, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’, ‘এই ক্যাম্পাসে হবে না, ছাত্ররাজনীতির ঠিকানা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে ছাত্র হলগুলোর সামনে দিয়ে প্রদক্ষিণ করেন। পরে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে পৌঁছালে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০ জন আহত হন। সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের কুয়েটের অ্যাম্বুলেন্সে করে একের পর এক হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। সন্ধ্যার পরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিতে দেখা যায়।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতা বলেন, ‘সোমবার ছাত্রদলের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে ছাত্রদলের ফরম বিতরণ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা আজ (মঙ্গলবার) সমাবেশ ডেকেছিলাম। আমরা উপাচার্যের কাছে একটি আবেদন করার কথা ভেবেছিলাম যে এই ফরম বিতরণের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের যেন বহিষ্কার করা হয় এবং ভবিষ্যতে যেন কুয়েটে কেউ কোনো ছাত্রসংগঠন না করতে পারেন।’
ওই নেতা বলেন, ‘আমরা আজ যখন উপাচার্যের কাছে যাচ্ছিলাম, তখন আমাদের কুয়েটের ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত, এ রকম কয়েকজন বাইরে থেকে আরও ১৫-২০ জনকে নিয়ে আসেন। তাঁরা আমাদের কটূক্তি করতে থাকেন এবং আমাদের কয়েকজনকে আক্রমণ করেন। এরপর আমরা তাঁদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়ে মেইন গেট ও পকেট গেট আটকে দিই। এরপর ছাত্রদলের ছেলেরা পকেট গেটে এসে ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন এবং স্লোগান দিতে থাকেন। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা পকেট গেটে জড়ো হই। বাইরে থেকে ছাত্রদলের ছেলেরা এবং স্থানীয় কিছু লোকজন এবং হেলমেট পড়া আরও অনেকে আমাদের ওপর তখন ইটপাটকেল ছোড়েন। রামদাসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁরা আমাদের আক্রমণ করতে আসেন। এতে আমাদের অনেকে আহত হন। মূলত এভাবেই ঘটনার সূত্রপাত।’
তবে ছাত্রদলের পক্ষে কুয়েটের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহুল জাবেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলের সামনে থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এতে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এটা ২০-২৫ মিনিট ধরে চলতে থাকে। এরপর আমরা ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রশিবিরের সমর্থক যারা আছে, তারা আমাদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে এবং বাইরের দোকানদারদের ওপর আক্রমণ করে। বাইরের লোকজন এটা মেনে নিতে পারেনি। এভাবেই ঘটনার সূত্রপাত হয়।’
কুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাফওয়ান আহমেদ ইফাজ জমাদ্দার বলেন, ‘তারা মিছিল করছিল রাস্তায়, আমরা ২৫-৩০ জন মাঠ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই সময় মিছিল থেকে আমাদের ধাওয়া করা হয়। আমাদের ওপর ইটপাটকেল ছোড়া হয়। এরপর পকেট গেটে এসে তারা স্থানীয় দোকানপাটেও ক্ষতি করে। তখন সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্যসচিব তাজিম বিশ্বাস বলেন, ‘ছাত্রশিবির এবং পতিত সরকারের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের যেসব নেতা-কর্মী এখনো আছে, যাদেরকে আমরা চিনি, তারাই মূলত আমাদের ছাত্রদলের নেতা–কর্মীদের ওপর প্রথমে হামলা করেছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে খুলনা মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরাফাত হোসাইন মিলন গণমাধ্যমকে বলেন, কুয়েটের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও বিএনপি নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে অনেককে আহত করেছেন বলে তিনি শুনেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুয়েটের সদস্যসচিব জাহিদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের গুরুতর আহত ৫০ জন শিক্ষার্থী। কমবেশি আহত ধরলে আহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০–এর বেশি।’
খুলনার খানজাহান আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কবির হোসেন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
উল্লেখ্য, গত ১১ আগস্ট সিন্ডিকেট সভায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমানে সারা দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা ও শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমের মাধ্যমে যখন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে আকৃষ্ট হচ্ছে অসংখ্য নবীন শিক্ষার্থী, ঠিক তখনই আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাজনীতির চর্চার মাধ্যমে প্রতিঘাতমূলক নানান গুপ্ত কার্যক্রম ও অপপ্রচারকে পুঁজি করে উস্কানি ও সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে গুপ্ত সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিবাদী সংগঠন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ওঈঈচজ)-এর ধারা নং ১৯, ২১ ও ২২ অনুসারে রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হয়ে বাকস্বাধীনতার চর্চা ও সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করা সকল শিক্ষার্থীর স্বীকৃত অধিকার। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে বর্তমানে ফ্যাসিবাদ ও দখলদারিত্বের চর্চা যখন অসম্ভব, তখন সেই ফ্যাসিবাদ ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতির ধারক-বাহক গুপ্ত সংগঠন শিবির ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত ও অবৈধ উপায়ে ক্যাম্পাসসমূহে সাধারণ শিক্ষার্থীর বেশ ধরে গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রেখে নিজেদের অঘোষিত দখলদারিত্ব জারি রাখার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্যাসিবাদী সংগঠন ছাত্রলীগ যেমন অতীতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামকে ভাঙিয়ে নিজেদের নানান অপকর্মের সাফাই দিতো, ঠিক সেভাবেই ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গুপ্ত সংগঠন শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামকে কলুষিত করছে এবং এই নাম ব্যবহারের মাধ্যমে হামলা চালিয়ে সহিংস ফ্যাসিবাদী কায়দা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
কুয়েটে ছাত্রদলের ওপর শিবিরের হামলা: বিএনপির নিন্দা
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) এর ক্যাম্পাসের বাহিরে ছাত্রদলের সদস্য ফরম বিতরনকালে ছাত্র শিবিরের হামলা ও ছাত্রদলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আহত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে খুলনা বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) প্রদত্ত বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, ছাত্রশিবির খুলনাকে উত্তাপ্ত করার জন্য ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অতর্কিত হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের মারাত্মক আহত করেছে। ছাত্র শিবির নিজেদের অবস্থান পরিস্কার না করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যানারে তারা নগরীতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে- যা মোটেই সর্মথনযোগ্য নয়। ছাত্রশিবির শান্তিপুর্ণ খুলনাকে অশান্ত করতে চায়। অবিলম্বে হামলাকারী শিবির ক্যাডারদের গ্রেফতার করতে হবে। অন্যথায় যেকোন পরিস্থিতির জন্য প্রশাসন দায়ি থাকবেন।
বিবৃতিদাতারা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, মহানগর বিএনপির আহবায়ক এড. শফিকুল আলম মনা, জেলা বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিন, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু হোসেন বাবু প্রমূখ।