ঢাকা অফিস।।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হয়েছে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও হত্যার বিচার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা, সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিচার দ্রুত করতে সাক্ষীর তালিকা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপনের সময় ছয় সপ্তাহ থেকে কমিয়ে তিন সপ্তাহ নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধনের পর অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনালে করা মামলাগুলোর মধ্যে তিন থেকে চারটির রায় অক্টোবর
মাসের মধ্যে হয়ে যাবে বলে আশা করছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
এদিকে আগামী ডিসেম্বরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর আলোচনা চলছে। ট্রাইব্যুনালে দ-িত হলে আসামিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দ- হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত হত্যাকা-ের বিচারকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ সংশোধনীর ফলে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর ইতোমধ্যে বিচারকাজে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এই আদালত কার্যক্রম শুরু করেছেন চার মাস আগে। এর মধ্যে এই ট্রাইব্যুনালে ৩০০টির বেশি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। প্রসিকিউশন দল যাচাই-বাছাই করে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৬টি মামলা করেছে। এর মধ্যে চারটি মামলার তদন্তকাজ এই মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে তারা মনে করছেন। এর পর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হবে।
উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরুর পর আইন অনুযায়ী ডিফেন্স টিমকে (আসামিপক্ষের আইনজীবী) তিন সপ্তাহ সময় দিতে হয় তাদের প্রস্তুত হওয়ার জন্য। এই তিন সপ্তাহ সময় শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে ঈদের পর এপ্রিল মাসে। এই আদালতে অব্যাহতভাবে শুনানি হয় বলে এসব মামলার রায় এপ্রিল থেকে শুরু করে পরবর্তী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেওয়া যাবে।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এই হিসেবে অক্টোবরের মধ্যে আমরা তিন-চারটি মামলার রায় পেতে যাচ্ছি বলে আশা করি। এটা বিচারিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। কিন্তু তদন্ত টিম বিশেষ করে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে আমার এই ধারণা হয়েছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা, শীর্ষস্থানীয় কিছু পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তা আসামি হিসেবে রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি : সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা এবং তল্লাশি ও আলামত জব্দ করার ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধনের পর তা অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন পায়। জাতীয় সংসদ চলমান না থাকায় রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এ অধ্যাদেশ জারি করেন, যার বিজ্ঞপ্তি গত সোমবার প্রকাশ করা হয়।
‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ নামের এই আইনের ৪, ৮, ৯, ১১, ১২ ও ১৯ নম্বর ধারা সংশোধন করা হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪ নম্বর ধারা সংশোধন করে আগ্রাসনকে বর্ণনা করা হয়েছে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে। ৮ নম্বর ধারার (৩এ) উপধারায় বলা ছিল, তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে তল্লাশি ও আলামত জব্দ করতে পারবেন। সংশোধনে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ৯ নম্বর ধারার (৩) উপধারায় বিচার শুরুর ছয় সপ্তাহ আগে সাক্ষীর তালিকা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপনের বিধান ছিল, সেটা তিন সপ্তাহ করা হয়েছে। ১১ নম্বর ধারায় একটি নতুন উপধারা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন যুক্ত (৯) উপধারায় বলা হচ্ছে- ট্রাইব্যুনাল আসামির সম্পদ অবরুদ্ধ বা জব্দের আদেশ দিতে পারবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সেসব সম্পদ ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত দিতে পারবে। আইনের ১২ নম্বর ধারার (৩) উপধারায় বলা ছিল, ট্রাইব্যুনালের মামলার প্রতিবেদনসহ নথি হবে গোপনীয়। এখন ওই নথির সঙ্গে অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে। ১৯ নম্বর ধারায় একটি নতুন উপধারা (৫) সন্নিবেশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আইনে যা কিছু থাকুক না কেন, ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্যের কারিগরি নিয়ম দ্বারা আবদ্ধ থাকবে না এবং দ্রুত এবং অ-কারিগরি পদ্ধতি গ্রহণ ও প্রয়োগ করতে পারবে।
বিচারকাজে বিলম্ব হচ্ছে বলে প্রচলিত ধারণার জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা জামায়াত ও বিএনপির নেতাদের বিচারকাজগুলো সম্পন্ন করতে প্রতিটি মামলায় গড়ে আড়াই বছর সময় লাগিয়েছিলেন। সেখানে এই আদালতে তার অর্ধেকেরও কম সময় লাগছে।
প্রসিকিউশন টিম দিনে-রাতে প্রচুর কাজ করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে যে বিচারকাজগুলো হয়েছিল, সেই ঘটনাগুলো ছিল অনেক আগের। আর এখন যে বিচার হচ্ছে এর এত বেশি সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে যে এক বছরের মধ্যে প্রথম কয়েকটা রায় পাওয়া যাবে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত হত্যার ঘটনায় সাধারণ আদালতে করা মামলাগুলোর বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, সাধারণ ক্রিমিনাল কোর্টে যে মামলাগুলো হয়েছে, সেগুলোর বিচার হয়তো একটু বিলম্ব হবে। ওই মামলায় যারা আসামি তাদের প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলায়ও রয়েছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলায় যদি রায় পেয়ে যাই, তা হলে সাধারণ কোর্টের মামলার রায় পেতে বিলম্ব হলেও আমাদের হতাশার কোনো কারণ নেই।
সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ও গায়েবি মামলা : বিগত সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা বলেন, সেই আইনের অধীনে মতপ্রকাশকে অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে যে মামলাগুলো করা হয়েছে প্রথমে সেগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে এ রকম ৩৯৬টি মামলা করা হয়েছিল তুলে ধরে আসিফ নজরুল বলেন, এসব মামলার মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় সরকারি আইনজীবীদের মাধ্যমে ৩৩২টি প্রত্যাহার করেছে। ৬১টি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী তিন/চার কার্যদিবসের মধ্যে সেগুলো প্রত্যাহার হয়ে যাবে। তিনটি মামলা প্রত্যাহার করতে পারব না। কারণ এটা উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে স্থগিত রয়েছে। যাদের নামে মামলা তাদেরকে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনতে হবে।
১৬ হাজার গায়েবি মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে : আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী পক্ষকে দমন ও হয়রানির জন্য যেসব গায়েবি মামলা হয়েছিল, সেগুলো ধাপে ধাপে প্রত্যাহার শুরু হচ্ছে, বলেছেন উপদেষ্টা। এক্ষেত্রে দেরির কারণও তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ নজরুল বলেন, পিপি নিয়োগ শেষ করে কাজ শুরু করেছি মাত্র দুই মাস আগে। এত অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লাখ লাখ মামলা আইডেনটিফাই করা খুবই কষ্টকর। ১৬ হাজার ৪২৯টি মামলা প্রত্যাহারের জন্য তালিকা করা হয়েছে। এক হাজার ২১৪টি মামলা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে। দেরির কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি মামলার রেকর্ড ঘেঁটে দেখতে হয় যে এটা জেনুইন নাকি গায়েবি মামলা, নাকি কারচুপি করে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির মামলা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির মামলা আমি তো প্রত্যাহার করতে পারি না। ফলে প্রতিটা কেস রেকর্ড দেখে দেখে কনফার্ম হতে হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে বলেছেন আইন উপদেষ্টা।
শেখ হাসিনার ন্যূনতম অপরাধবোধ নেই : সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে ‘কুৎসা ও উসকানিমূলক’ কথা বলতে দিয়ে ভারত এ দেশে ‘অস্থিতিশীলতা’ তৈরির প্রচেষ্টা করছে ও করবে। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তিটিও সরল বিশ্বাসে প্রতিপালনের ইচ্ছা ভারতের নেই। তিনি বলেন, ভারতে থাকা শেখ হাসিনার প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের কারণে আওয়ামী লীগের ‘অনুশোচনাহীন’ নেতাকর্মীরা দেশে অস্থিতিশীলতার নতুন চক্রান্ত করছেন। সেটির সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করা হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কতটা আশাবাদী, এই প্রশ্নের উত্তরে আইন উপদেষ্টা বলেন, সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবে ভারতের মনোভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তারা নানান অজুহাতে এটাকে নাকচ করার চেষ্টা করবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেওয়া হাসিনার সর্বশেষ ভাষণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় যে ঔদ্ধত্য নিয়ে কথা বলতেন গত ৬ ফেব্রুয়ারি ঠিক একই টোনে কথা বলেছেন। গণ-অভ্যুত্থানে আমাদের যন্ত্রণার স্মৃতিগুলো নিয়ে তিনি পরিহাস করেছেন। এইআই দিয়ে আবু সাঈদের হত্যার দৃশ্য বানান হয়েছে বলে তিনি বলেছেন। এগুলো কি সহ্য করা যায়?











































