Home জাতীয় দুই খুনীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা

দুই খুনীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা

9

শংকর কুমার দে

৪৫ বছর আগে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের এই দিনে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের রচনা করেছিল ঘাতক চক্র। খুনী মোশতাক-জিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী ঘাতক চক্রের সদস্য ৩২ নম্বরের বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার ৪৫ বছর পরও ৫ খুনীর ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধু খুনের নেপথ্য দেশী-বিদেশী চক্রান্তকারী বিচারের বাইরে থাকলেও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১২ খুনীর মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করেছে সরকার, এক খুনী মারা গেছে বিদেশে এবং অপর ৫ খুনী এখনও পলাতক। পলাতক ৫ খুনীর মধ্যে ২ খুনীর একজন আছেন যুক্তরাষ্ট্রে ও অপরজন কানাডায়। অপর পলাতক ৩ খুনীর কে-কোথায় আছে তা জানে না সরকার। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতিতে যে কোন দিন তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে সরকার আশাবাদী। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিকে কানাডা ফিরিয়ে দেয় না। কানাডায় অবস্থানকারী নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি জটিল হলেও আইনী প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে। মুজিববর্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে খুনের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক পাঁচ খুনীকে দেশে ফিরিয়ে এনে সর্বোচ্চ আদালতের রায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্য ক্ত করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিঠি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থারত খুনী রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেছেন, মুজিববর্ষে ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের একজনকে দেশে ফিরিয়ে এনে আমরা ফাঁসির রায় কার্যকর করেছি, এখনও যেসব খুনী বাইরে আছে তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ চলছে। কানাডায় অবস্থানরত নূর চৌধুরীর সর্বশেষ অবস্থান নিয়ে সে দেশের সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করে খুনী মোশতাকের নেতৃত্বে আত্মস্বীকৃত খুনী চক্র। সে সময় দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মধ্যমে এই হত্যাকান্ডর বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীরা ছাড়া পেয়ে যায়। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ খোলে। তখন বিচার শুরু হলেও বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিচারের গতি শ্লথ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালের ৮ নবেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপীল ও মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে ৩ জনকে খালাস দেয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা সম্পন্ন হয়। ২০০৯ সালের ১৯ নবেম্বর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া ৫ আসামির আপীল খারিজ করে।

ছয় জনের ফাঁসি কার্যকর: জাতির পিতা হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ৫ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারিতে। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে যে ৫ জনের মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করা হয় তারা হচ্ছে, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), এ কে বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের (আর্টিলারি)। এর পর মুজিববর্ষে গত ১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর করা হয় ক্যাপ্টেন (অব) আবদুল মাজেদের। আবদুল মাজেদ ভারত থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসার পর গ্রেফতার হওয়ার পর তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আবদুল মাজেদকে নিয়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামির মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। গত ৭ এপ্রিল পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) তাকে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে। ঐ সময় আদালতের কাঠগড়ায় ওঠানোর পর পাবলিক প্রসিকিউটরের প্রশ্নের জবাবে মাজেদ জানিয়েছিল সে ২৩/২৪ বছর ভারতের কলকাতায় আত্মগোপনে ছিল। ২০০১ সালের জুনে পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অপর আসামি মেজর (অব) আবদুল আজিজ পাশা মারা যায় জিম্বাবুইয়েতে।

পলাতক ৫ খুনী: মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতক ৫ খুনীর মধ্যে আছেন, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল ইসলাম ডালিম, মেজর (বরখাস্ত) আবু মোহাম্মদ রাশেদ চৌধুরী, মেজর (বরখাস্ত) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী কানাডা, এবং রিসালদার (বরখাস্ত) মোসলেহ উদ্দিন। পলাতক ৫ খুনীর মধ্যে খুনী রাশেদ চৌধুরী আছে যুক্তরাষ্ট্রে এবং কানাডায় আছে নূর চৌধুরী। অপর ৩ খুনীর অবস্থান খুঁজে বের করতে রেড নোটিস জারির পর তা নবায়ন করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। ২০০৯ সালে এই নোটিশ জারির পর প্রতি পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করা হচ্ছে। শোকের মাস আগস্টে, বিদেশে পলাতক খুনীদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া জোরদার করতে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সরকার গঠিত টাস্কফোর্স।

যুক্তরাষ্ট্রে রাশেদ চৌধুরী: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুনী রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য গত সেপ্টেম্বরে চিঠি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। সেই চিঠির ধারাবাহিকতায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাকে যে কোন দিন বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার অগ্রগতিতে আশাবাদী হয়ে উঠেছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করে অবস্থান করছে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত রাশেদ চৌধুরী। প্রায় ১৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মিথ্যা প্রমাণপত্র দাখিল করেন রাশেদ এবং পরে তার রাজনৈতিক আশ্রয় মঞ্জুর হয়। মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ প্রমাণিত হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুনী রাশেদ চেšধুরকে বহিষ্কার করা হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত।

কানাডায় নূর চৌধুরী: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ওই বছরের ৫ জুলাই কানাডায় প্রবেশ করেন স্ত্রীসহ বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরী। শেখ হাসিনার এই মেয়াদকালে (১৯৯৬ থেকে ২০০১) নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী কানাডায় উদ্বাস্ত হিসেবে বসবাসের জন্য দেশটির সরকারের কাছে আবেদন করেন। কিন্তু ২০০২ সালের ১ আগস্ট তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে কানাডার ইমিগ্রেশন এবং রিফিউজি বোর্ড। এর বিরুদ্ধে অটোয়াতে ফেডারেল কোর্টে আপীল করলে ২০০৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাদের আপীল ডিসমিস করে দেয় আদালত। পুনরায় ডিসমিস আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করেন নূর চৌধুরী। কিন্তু সেটিও খারিজ হয়ে যায়। এরপর ২০০৬ সালে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য কানাডা সরকার বাংলাদেশকে চিঠি দেয়। কিন্তু তৎকালীন সরকারের অনাগ্রহের কারণে তখন নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনার সুযোগ হাত ছাড়া হয়। ২০০৮ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নূর চেীধুরী কানাডার এ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে একটি প্রি-রিমোভাল রিস্ক এ্যাসেসমেন্ট দরখাস্ত করে জানায়, তাকে যদি ওই দেশ থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, তবে তাকে ফাঁসি দেয়া হবে। এরপর গত ১০ বছরে কানাডার সরকার এই দরখাস্তটি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। ২০১৮ সালের জুন মাসে কানাডার ফেডারেল কোর্টে বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি রিট অব ম্যানডামাস দাখিল করে। কোর্টের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চেয়ে নূর চৌধুরী কানাডায় কীভাবে অবস্থান করছে (স্ট্যাটাস) সেটিও জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ। কানাডার আদালতে এ বছরের মার্চে এ বিষয়ে একটি শুনানি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসে নূর চৌধুরীর বিষয়ে রায় দেবে আদালত। তবে সরকারের করা এই মামলাটি মূলত নূর চৌধুরীকে ফেরত আনার বিষয়ে নয়। এ মামলায় সেদেশে তার স্ট্যাটাস জানতে চাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কানাডা সরকার কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি। যেহেতু এ ধরনের মামলায় শুনানি হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে রায় হয়ে থাকে। যেহেতু মার্চে হিয়ারিং হয়েছে, তাই আমরা ধারণা করছি, সেপ্টেম্বরের মধ্যে মামলার রায় পাওয়া যেতে পারে। রায়ের পরে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। আর আদালত যদি নূর চৌধুরীর স্ট্যাটাস জানানোর ক্ষেত্রে অস্বীকৃতি জানায়, তবে আপীল করা হবে। আর যদি আদালত তার স্ট্যাটাস জানায়, তবে ওই স্ট্যাটাসের ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে তাকে প্রত্যাবাসনের জন্য আবেদন করা হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভিডিও বার্তায় বলেন, নূর চৌধুরী কানাডায় কীভাবে আছেন তার কাগজপত্র বাংলাদেশকে দিতে সম্মতি দিয়েছে দেশটির আদালত। তিনি বলেন, কানাডায় নূর চৌধুরী পলাতক আছেন। নূর চৌধুরী কানাডীয় সরকারকে বলেছেন বাংলাদেশে তাকে একটি মামলায় ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। কানাডীয় সরকারের একটি আইন আছে যেটা হচ্ছে, যে দেশে মৃত্যুদন্ড আছে, সেখানে মৃত্যুদন্ড হতে পারে, এ রকম কোন আসামিকে ফেরত পাঠায় না। সেই আবেদনের কারণে তিনি সেখানে বসবাসরত। অইনমন্ত্রী বলেন, সে (নূর চৌধুরী) কানাডীয় সরকারের কাছে কী লিখেছে এবং কী পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সেখানে থাকার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলো জানার জন্য আমরা কানাডীয় সরকারের কাছে সেই কাগজপত্রগুলো চেয়েছিলাম। কানাডীয় সরকার জবাব দিয়েছে যে, তাদের প্রাইভেসি এ্যাক্টে এসব কাগজ দেয়া যায় না। তখন আমরা সেখানে আইনজীবী নিয়োগ করে আদালতে আবেদন করেছিলাম। আদালত বলেছে, কাগজগুলো দেয়া যাবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এখন অগ্রসর হচ্ছি।

তিন খুনী কোথায়: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার পলাতক তিন খুনী লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল (অব) শরীফুল হক ডালিম ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন খান। এই তিন খুনীর অবস্থান এখনও অজানা। তবে খন্দকার আবদুর রশিদ পাকিস্তান বা লিবিয়ায় কিংবা বেলজিয়ামে অবস্থান করতে পারে এমন খবর পাওয়া যায়। বেশিরভাগ সময় লিবিয়াতে থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন তিনি। শরিফুল ইসলাম ডালিম পাকিস্তান বা লিবিয়া অবস্থান করছেন অসমর্থিত সূত্র এমন খবর দিয়েছে। খুনীদের খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক পুলিশ-ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা হয়েছে। সরকার গঠন করেছে টাস্কফোর্স। পলাতক তিন খুনীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার।