Home জাতীয় উবারের বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো

উবারের বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো

10

উদিসা ইসলাম

করোনা মহামারির মাঝে যাত্রী বহনের সময় যাত্রী ও চালক উভয়কেই মাস্ক পরা থাকতে হবে। প্রতি রাইডের আগে এবং পরে স্যানিটাইজার ব্যবহার করে যাত্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এসব নানা নিয়মের মধ্যদিয়ে রাইড কনফার্ম করলেও গাড়িতে ওঠার আগে বা পরে এর কিছুই মানতে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি যাত্রীর মাস্ক না থাকলেও তাকে বহন করতে চালকের পক্ষ থেকে কোনও আপত্তি জানাতে দেখা যায়নি। শঙ্কার বিষয় হলো, রাইড শুরু হওয়ার আগে যে নিয়মগুলো অ্যাপে লেখা আসে, সেগুলো চালকরা পড়েও দেখেন না। যদিও উবার বলছে, তারা কিছু লিখিত নীতিমালার ব্যবস্থা করেছে। এসব মেনে তবেই উবারের গাড়ি চালানো যাবে। এদিকে সেবা গ্রহীতারা বলছেন, যাত্রীদের চেয়ে চালকরাই বেশি পারেন সতর্ক থাকতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করতে।

করোনা পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে রাইড শেয়ারিং শুরু হয়েছে, এমন দাবি করা হলেও গত সোম ও মঙ্গলবার উবার ব্যবহার করে দেখা গেছে, এই নিয়মনীতি কেবলমাত্র উবারের কাগজে-কলমেই। বাস্তবে এধরনের কোনও ব্যবস্থা নেই। অনেক নিয়মের বাক্যের সঙ্গে একমত হয়ে রাইড নিশ্চিত করার পর গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখবেন যে, এর কিছুই নেই। লালমাটিয়া থেকে উবারের গাড়ির জন্য অ্যাপ ওপেন করতেই ভেসে আসেÍ ‘করোনা পরিস্থিতিতে যাত্রী ও চালক মাস্ক পরবেন। প্রতিটি রাইড শুরুর আগে ও পরে স্যানিটাইজার দিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চালকের ফেস কাভার নিশ্চিত করতে হবে। দুজনের বেশি যাত্রী ওঠানো যাবে না। সামনের সিটে বসা যাবে না। নিজেদের ব্যাগ-মালপত্র ওঠানো-নামানো নিজেদেরই করতে হবে। ভাড়ার টাকা যা আসে সেই পরিমাণ টাকা চালককে দিতে হবে, যাতে করে তার কাছ থেকে টাকা নিতে না হয়।’ শর্ত বা নিয়মগুলোর সঙ্গে একমত কিনা, তা জানানোর পর চালকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কিন্তু চালক আসার পরে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যাত্রী মাস্ক না পরে  গাড়িতে উঠলেও চালক কোনও উচ্চবাচ্য করেননি। কী নিয়ম মানতে বলেছেন কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক চালক বলেন, ‘দুই জনের বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। মাস্ক পরতে হবে। এইতো, এর বেশি কী আর সুরক্ষা।’ তাহলে নিজে বা যাত্রীকে স্যানিটাইজার দিলেন না কেন, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না।’

কী আছে উবারের নতুন নির্দেশনায়: করোনা পরিস্থিতিতে সাবধানতা অবলম্বন করতে চালক ও যাত্রীদের নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে উবার কর্তৃপক্ষ। রাইডশেয়ারিং করার সময় স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক নির্দেশিকাÍ ‘বৈশ্বিক ও স্থানীয় জনস্বাস্থ্য বিবেচনা করে এই স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে, যা সব চালক ও যাত্রীদের দেওয়া হবে’, বলে উবার থেকে জানানো হয়। এতে বলা আছে, ‘চালক বা যাত্রী যে কেউই অনিরাপদ বোধ করলে তাৎক্ষণিক তারা যাত্রা বাতিল করতে পারবেন। যে কারোরই মাস্ক না পরা বা মুখ না ঢাকা থাকলেও তারা যাত্রা বাতিল করতে পারবেন। উবার ট্রিপে থাকাকালীন চালক ও যাত্রীদের পেছনের সিটে বসার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। এখন থেকে চালক ব্যতীত গাড়িতে শুধুমাত্র দুজন যাত্রী বসতে পারবেন।’ সোমবার (১৩ জুলাই) আরেক রাইডে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করা হয়, যে নিয়মগুলো মানার কথা, অ্যাপ চালু করলে স্ক্রিনে ভেসে আসে, সেখানে কী বলা আছে জানেন কিনা, তিনি বলেন, ‘মালিক পড়ে বলেছেন। কিন্তু যাত্রীরা মানতে চায় না। এমনিতেই তিন মাস ঘরে বসে ধার দেনায় জর্জরিত। এখন এসব নিয়ম টিয়ম দেখালে সামনে খাবার জুটবে না। তাই চুপ থাকি।’ চালকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তারা বারবার  অভিযোগ করেন যে, যাত্রীরা সতর্কতা অবলম্বন করতে চান না। সারাদিনে উবার কারে নানা জন ওঠেন। ফলে ওঠার সময় স্যানিটাইজার বা অন্যকিছু দিয়ে হাত পরিষ্কার করা, বা গাড়ি থেকে নেমে একই কাজ করা হয় কিনা প্রশ্নে উবার যাত্রী তারেক হোসেন বলেন, ‘সবসময় করা হয় না। চালককেও বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে দেখিনি।’

বিআরটিএ’র আদেশে কী আছে: দেশে গত মার্চ মাসে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে বাসার বাইরে গিয়ে অবাধে চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। সেসময় প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিল গণপরিবহনসহ এসব রাইডশেয়ারিং সেবা। পরবর্তীতে ছুটি আর না বাড়িয়ে প্রথমে  সীমিত পরিসরে, পরে ধীরে ধীরে আফিস-আদালতসহ সবকিছু খুলে দেওয়া হয়। এই পর্যায়ে বিআরটিএ একটি আদেশ জারি করে। ওই আদেশে বলা হয়, ‘কোভিড-১৯ জনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিকালীন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনায় বিআরটিএ থেকে রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাপস ব্যবহার করে শুধু রাইড শেয়ারিং মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত মোটরকার, জিপ, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্স (মোটরসাইকেল ছাড়া) স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে ২১ জুন থেকে ঢাকা মেট্রো, গাজীপুর মেট্রো, ঢাকা জেলা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর জেলা এলাকায় চলাচলের জন্য অনুমতি প্রদান করা হলো।’ উবার প্রাইভেট গাড়ি হলেও এটা গণপরিবহনের মতোই। কারণ, উবারের গাড়িতেও একের পর এক যাত্রী ওঠানামা করে। এতে করে সংক্রমণের শঙ্কা থেকেই যায় উল্লেখ করে প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যথেষ্ট নিয়ম না মেনে এটা চালু করা ঠিক হয়নি। চাইলেই উবারের ক্ষেত্রে এটা মানার সুযোগ ছিল।’ উবারের সরবরাহ করা নিয়ম চালকরা মানছেন না, এ বিষয়ে উবারের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা তাদের নীতিমালার বিষয়টিই আবারও উল্লেখ করে। উবারের বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের প্রধান রাতুল ঘোষ বলেন, ‘চালক ও যাত্রীদের নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য আমাদের বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও সেফটি প্রোডাক্ট টিম নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যেহেতু জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তাই নিজেদের নিরাপদ রাখতে ও সবার জন্য যাত্রা নিরাপদ করতে সব প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা গুরুত্বপূর্ণ। সেদিকে লক্ষ্য রেখে নতুন ফিচার ও নীতিমালা বিশ্বব্যাপী চালু করা হয়েছে এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজজন অনুযায়ী এগুলো আরও উন্নত ও সংশোধন করতে থাকবো।’