খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার নবগ্রাম বাজার সংলগ্ন খাল পাড়ে রয়েছে শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ। গাছটি নিয়ে ধারণ করা হয়েছিল লোকনাটক গুনাই বিবির একটা পর্বের দৃশ্যও। যদিও গ্রামের লোকজন বলছেন, এখানে আদৌ কোনো পর্ব রেকর্ড হয়নি। পুরোটাই কাল্পনিক, যা এলাকাবাসীর কাছে রূপকথার গল্পের মতো।
এলাকার প্রবীণ শিক্ষিত শরীফ আবু সুফিয়ান আব্বাসী জানান, দাদার কাছে গুনাই বিবি নাটকের কাহিনী শুনেছি। কিন্তু নবগ্রামের রেইন্ট্রি গাছের নিচে বসে ‘ও কোকিল ডাইকো না ডাইকো না ওই কদমের ডালে, শীত বসস্তের সুখের কালে আমার পতি নাই ঘরে’ গানটিতে নাটকের যে পর্বের কথা জনশ্রুতি রয়েছে, তা কাল্পনিক। এটা এক ধরনের রূপকথার গল্পের মতো।
ঝালকাঠির লোককথা ও ইতিহাস ঐতিহ্যের গবেষক মুহাম্মদ আল আমীন বাকলাই বলেন, ঝালকাঠি জেলা ব্র্যান্ডিং বুক করতে গিয়ে জনশ্রুতি অনুযায়ী ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েছি। কোথাও গুনাই বিবির কোনো স্মৃতি কিংবা গুনাই বিবি নাটকের কোনো স্মৃতি কেউ বলতে পারেনি। তবুও মানুষের মুখে মুখে রূপকথার গল্পের মতো অমলিন রয়েছে।
‘গুনাই বিবি’ বাংলার চিরায়ত লোকগাথা নয়। সত্য ঘটনাই গ্রাম্য লোককবির বয়ানে পেয়েছে চিরায়ত রূপ। রবিশাল অঞ্চলে থেকে উৎসারিত যে দুইটি কাহিনী সারাদেশে প্রচারিত ও জনগৃহীত তার মধ্যে ‘আসমান সিংহ’ ও ‘গুনাই বিবি’ উল্লেখযোগ্য।
‘গুনাই বিবি’ লোকমুখে গীত ও পরিবেশিত হতে হতে টিকে আছে। লোকগাথার শক্তিই এমন। এই কাহিনী প্রথম কে সংগ্রহ করেছিল, তা আর নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। অনেকের মতে, এটি ঝালকাঠি জেলায় জন্ম নিলেও এখন সকল বাঙালির সম্পদ। ময়মনসিংহ গীতিকার মতো এর আবেদনও সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। অঞ্চলভেদে এই কাহিনীর পাঠান্তর ঘটলেও মূল চেতনা অক্ষুন্ন রয়েছে।
‘দাদা, আর যাব না অই স্কুলে পড়তে’ গুনাইর কান্নাজড়িত সুরের এই গান দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি মানুষ জানে। আর এই গান যেকোনো বাঙালির মনেই আলোড়ন তোলে। প্রচলিত এই লোকগাথাই কিস্সার আসরে পরিবেশিত হয়। একসময় এটি যাত্রার মঞ্চে উঠে আসে। কেবল ‘গুনাই বিবির পালা’ পরিবেশনের জন্য বরিশাল অঞ্চলে কয়েকটি অ্যামেচার যাত্রাদলও গড়ে ওঠে একসময়।
যেহেতু এটি প্রচলিত লোকগাথা, তাই এর অনেক অসংগতিকে মেনে না উপায় থাকে না। এই কাহিনীর রচয়িতা গ্রামের কোনো নিরক্ষর কথক। কাহিনীতে আছে গ্রামের পাঠশালায় পড়ে গুনাই ও তোতা। পাঠশালা অবশ্যই গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গাছতলায় বসা পাঠশালায় অবশ্যই লোকজ আবহ রয়েছে। গুনাই বিবির কাহিনী নিঃসন্দেহে শতবর্ষ ধরে চলে আসছে। সেই সময় মুসলিম সমাজে সহশিক্ষার সুযোগ ছিল না বলেই জানি। কিন্তু ‘গুনাই বিবি’র তোতা-গুনাই একসঙ্গে পাঠশালায় পড়ে। নায়ক তোতা স্কুলে নায়িকা গুনাইকে খুব জ্বালাতন করে। তাই সে রাগে অভিমানে ভাইয়ের কাছে নালিশ করেন।
দাদা আর যাব না ঐ ইশকুলেতে
ঐ ইশকুলেতে যেতে গেলে দাদা
ঐ দাদা সম্মান বাঁচে না।
ঐ ইশকুলের তোতা মিয়া
দাদা গো, গালি দিল মোরে
দাদা আর যাব না ঐ ইশকুলেতে॥
গুনাইয়ের ভাই রফিক স্কুলের শিক্ষকের কাছে তোতার বিরুদ্ধে নালিশ করায় তোতাকে বেতের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এতে গুনাই মর্মযাতনা অনুভব করে। প্রতিটি বেতের বাড়ি মনে হয় গুনাইয়ের পিঠে লাগে। স্কুল শেষে গুনাই অনুতাপ প্রকাশ করে তোতার কাছে। গুনাই তোতার ক্ষতস্থানে ওষুধের পাতা লাগিয়ে দেয়। তোতার কাছে গুনাই ক্ষমা চায়। এরপর দুইজনের অনুরাগ জমে ওঠে। গ্রামের বিভিন্ন বাগানে তারা দেখা করে মনের কথা বলে। গানে গানে হৃদয়ের ভাব প্রকাশ করে।
শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ
শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ
নায়ক তোতার মা নেই। বাবা মৃত্যুশয্যায় চাচা দলিলুদ্দিনকে তোতার ভার দেয়। কিন্তু দলিলুদ্দিন তোতাকে লেখাপড়া শেখাতে চায় না। তার সম্পত্তি কেড়ে নেযার ষড়যন্ত্র করে। একসময় চাচা দলিলুদ্দিন গুনাইয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়। তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে দলিলুদ্দিন ক্ষেপে ওঠে। একসময় তোতার সঙ্গে গুনাইয়ের বিয়ের আয়োজন হলে দলিলুদ্দিন ক্ষেপে ওঠে। সে গুনাইয়ের এক ভাই খালেককে লোভ দেখিয়ে বড় ভাই রফিককে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার পরামর্শ দেয়। তোতা গুনাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে শোনা যায় চিরায়ত বিয়ের গান।
আজ বুঝি তোরে যাবে লইয়া লো বুবুজান
আজ বুঝি তোরে যাবে লইয়া॥
শ্বশুরবাড়ি যাবি রে তুই ঘোমটা মাথায় দিয়া
হলুদবরণ অঙ্গে দেব হলুদ মাখাইয়া॥
হায় হায়!
সবাই মিলে দিবে তোরে গোছল করাইয়া॥
বিয়ের আনন্দ-আয়োজনের ফাঁকে গুনাইয়ের ছোট ভাই বিষ খাইয়ে বড় ভাইকে মেরে ফেলে। পরে অনুতাপে দগ্ধ হয়ে খালেক নিজেও বিষপানে আত্মহত্যা করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। দুই ভাইকে হারিয়ে গুনাইকে কণ্ঠের সুরে ফুটে ওঠে হাহাকার ধ্বনি।
আগে যদি জানতাম গো দাদা
জানতাম গো দাদা যাইবা গো ছাড়িয়া
জন্ম আমি নিতাম না দাদা, তোমার বইন হইয়া॥
খালেকের মৃত্যুর পরে যে গানটি পরিবেশিত হয়, তা হলো
ও দাদা খালেক রে,
খালেক রে দাদা, করলি একি তুই?
ভাইকে মারিলি নিজেও মরিলি
এখন কী করি মুই!
কত সুখে ছিলাম গো আমি
ছিলাম গো আমি তোমাদের আদর পাইয়া
সেই কথা আজ মনে হইলে
আমার পরান যায় ফাটিয়া॥
গুনাই তোতার বিয়ের পরেও দলিলুদ্দিনের ষড়যন্ত্র থামে না। তোতার ঘর পুড়িয়ে দেয়। এখন কী আর করা! তোতা সংসার খরচ জোগানোর জন্য বরিশাল শহরে যেতে চাইলে গুনাই নিষেধ করে। নিষেধের বাণী ফুটে ওঠে গুনাইয়ের গান
চাকরিতে না যাইও না রে বন্ধু
চাকরিতে যাইও না
চাকরির নামে বিদেশ যাইয়া ভুইলা থাইক না।
দলিলুদ্দিন গুনাইকে দেখার জন্য বাড়ির পাশে একটি বকুলগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। তোতার গাছটি কেটে ফেলার জন্য মালিক কাঠুরিয়াকে ডাকে। এরপর মালিক গাছচাপা পড়লে তাকে রক্ষা না করে বরং মেরে ফেলে। তারপর পুলিশ ডেকে তোতাকে ধরিয়ে দেয় কাঠুরিয়া। তোতার ঠাঁই হয় বরিশালের কারাগারে। এইবার দলিলুদ্দিন গুনাইকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু যাত্রার বিবেকের মতো এক দরবেশ দলিলুদ্দিনকে গানে গানে সত্তক করিয়ে দেয়।
গুনাই এক যাকে। গাছে ডাকে কোকিল। কোকিলের ডাকে বিরহী গুনাইয়ের অন্তর কেঁদে ওঠে তাই গেয়ে ওঠে।
ও কোকিল ডাইকো না ডাইকো না
ওই কদমের ডালে
শত বসন্ত সুখের কালে
আমার পতি নাই ঘরে
একদিন গুনাইয়ের ঘরে ঢুকে দলিলুদ্দিন ‘তার ইজ্জত লুটে নিতে চায়। এই সময় দলিলের পোষা চামচা-ই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সে গুনাইকে রক্ষা করে। তার পরামর্শে গুনাই বরিশাল যায় তোতার খোঁজ নিতে। মামির কণ্ঠে ভেসে আসে ভাটিয়ালি সুর-
গঙ্গায় তরঙ্গ ঢেউ খেলে,
ও বুবুজান গঙ্গায় তরঙ্গ ঢেউ খেলে॥
আগি দিয়া আসে ঢেউ,
পাছা নায়ে ঠেলে
আল্লার নাম জপোরে বাঁচিতে চাইলে॥
আল্লা বিনে গতি নাইরে
জীবননদের ভেলে॥
বরিশাল এসে গুনাই জানতে পারে যে তোতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে বিচারকের কাছে পুনর্বিচারের আর্তি জানায়। বিচারক পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিলে তোতা যে নির্দোষ তা প্রমাণিত হয়। দলিলুদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হয়। গুনাই আর তোতা গ্রামে ফিরে আসে।
শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ
শতবর্ষী রেইন্ট্রি গাছ
অনেকে মনে করেন, গুনাই বিবির পালা একটি সত্য ঘটনাশ্রয়ী। ব্রিটিশ শাসনামলে ঝালকাঠির বর্ধিষ্ণু নবগ্রাম এলাকায় গুনাই ও তোতার প্রেম পরিণয়ের কাহিনী রচিত হয়। একেএম শহিদুল হকের নাটকে তোতা মিয়ার পরিচয় দেওয়া হয়েছে বরিশালের শালগ্রামের জমিদারপুত্র হিসেবে।
হুমায়ুন রহমানের সংগৃহিত কাহিনীতে এটি বরিশালের রূপাইনগর বলা হয়েছে। নতুন কোনো লেখক হয়তো নতুন কোনো গ্রামকে প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নেবেন। এভাবেই এটি সমবেত লোক মানুষের রচনা হিসেবে গ্রাহ্য হয়ে উঠেছে।
গুনাই বিবির কাহিনী নিয়ে সর্বপ্রথমে কালজয়ী নির্মাতা শফি বিক্রমপুরী ১৯৬৫ সালে দক্ষিণাঞ্চলের লোকজ প্রেম কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গুনাই বিবি’ সিনেমাটি যৌথ প্রযোজনার মাধ্যমে প্রযোজনা করেন।
১৯৬৬ সালে দুইটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। সৈয়দ আউয়ালের চলচ্চিত্রের নাম ‘গুনাই বিবি’, বজলুর রহমানের চলচ্চিত্রের নাম ‘গুনাই বিবি’। আর ১৯৮৫ সালে হারুনুর রশীদ নির্মাণ করেন ‘গুনাই বিবি’ নামে রঙিন চলচ্চিত্র। তবে এসব চলচ্চিত্রের জন্য নতুন করে গানও রচিত হয়। হারুনুর রশীদের চলচ্চিত্রের জন্য ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ও হাসান মতিউর রহমান গান রচনা করেন। সেগুলোও এখন গুনাই বিবির গান নামে প্রচলিত হয়ে উঠেছে। কিচ্ছা, নাটক, যাত্রা ও চলচ্চিত্র প্রভৃতি মাধ্যমে গুনাই বিবি-কাহিনী প্রতিনিয়ত ব্যাখ্যাত ও পরিমার্জিত হয়ে লোকমানসে স্থায়ী ও চিরায়ত রূপ ধারণ করেছে। এটি বরিশালের গন্ডি পেরিয়ে এখোন বাঙালির লোকসম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









































