Home আঞ্চলিক খুলনায় পুলিশের অবৈধ আয়ের হাতিয়ার ‘কেএমপি অধ্যাদেশ’

খুলনায় পুলিশের অবৈধ আয়ের হাতিয়ার ‘কেএমপি অধ্যাদেশ’

38

স্টাফ রিপোর্টার।।

অবরোধের সমর্থনে গত ১৮ নভেম্বর মিছিল বের করলে বিএনপির পাঁচ নেতাকর্মীকে আটক করে খানজাহান আলী থানা পুলিশ। পরদিন থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমানসহ চারজনকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

একই সময় গ্রেপ্তার পঞ্চম আসামি সোহাগ মোল্লাকে আদালতে পাঠানো হয় ‘কেএমপি অধ্যাদেশে’। ওই দিনই ১ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পান তিনি। সোহাগ মোল্লা খানজাহান আলী থানা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক।

সোহাগ মোল্লার মতোই এক মাস ধরে চলা পুলিশের ধরপাকড়ে আটক ব্যক্তিদের একটি অংশকে আদালতে পাঠানো হচ্ছে কেএমপি (খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ) অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায়। এতে ওই দিনই জরিমানা দিয়ে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, থানা পুলিশের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়ে এই কাজ করছেন। নিরীহ ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে এই অধ্যাদেশে। প্রতি জনের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লেনদেন হচ্ছে। টাকা দিলে দিনের মধ্যেই মুক্তি পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

মহানগর বিএনপির সদস্য শরিফুল ইসলাম টিপু জানান, গত ২৬ অক্টোবর থেকে খুলনায় বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশের ধরপাকড় চলছে। নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা হয়েছে ছয়টি। নতুন ও পুরোনো মামলায় গত এক মাসে বিএনপির ১৭০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর বাইরে আরও ২০-২৫ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে কেএমপি অধ্যাদেশ এবং ১৫১ ধারায়। কেএমপি অধ্যাদেশে আটক ব্যক্তিরা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। বেশির ভাগ সময় তারা পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেন। থানা পুলিশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে মুক্তি পাচ্ছে বুঝতে পেরে আমরাও বিষয়টি চেপে যাই।

খুলনা মুখ্য মহানগর হাকিমের হাজতখানার তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের প্রথম ২১ দিনে খুলনা মহানগরীর ৮টি থানা এবং জেলখানা থেকে ৮৭৭ আসামিকে আদালতে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৮ জনকে আটক দেখানো হয় কেএমপি অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায়। অবশ্য এর মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয় অনলাইনে জুয়া খেলার অপরাধে।

খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তারিক মাহমুদ তারা বলেন, কেএমপি অধ্যাদেশের ৫৯টি ধারায় কিছু অপরাধে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সাধারণত গণউপদ্রব সৃষ্টি, প্রকাশ্যে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করা, জুয়া খেলা, মারমুখী আচরণসহ ছোট অপরাধে জড়িতদের এই অধ্যাদেশে আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এতে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ওই দিনই মুক্তি পান আসামিরা।

আদালত, থানা পুলিশ এবং বিএনপি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর খানজাহান আলী থানা ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল খান ও ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল কর্মী নাদিম, ১০ নভেম্বর ছাত্রদলকর্মী শিমুল, ১৪ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা লিয়ন শেখ, ১৪ নভেম্বর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল মোল্লা ও ১৮ নভেম্বর রাতে সোহাগ মোল্লাকে আটক করে খানজাহান আলী থানা পুলিশ। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে কেএমপি অধ্যাদেশে। ওই দিনই মুক্তি পেয়েছেন তারা। এ সময় আটক করা হয় আরও ৯ বিএনপি নেতাকর্মীকে। তাদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গত ১৯ নভেম্বর দুপুরে খুলনা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে উপস্থিত ছিলেন এ প্রতিবেদক। গারদের সামনে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সোহাগের স্বজনও উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় শুনে সোহাগ মোল্লার গ্রেপ্তারের বিষয়টি চেপে যাওয়ার অনুরোধ করেন ওই স্বজন। তিনি জানান, অনেক কষ্টে থানা ‘ম্যানেজ’ করেছি। জানাজানি হলে সমস্যা হবে।

আগের রাতে সোহাগ মোল্লার সঙ্গে গ্রেপ্তার যোগীপোল ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন খোকা বলেন, তাকেও ছেড়ে দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন এক দারোগা। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পরও পালিয়ে থাকতে হবে, দোকান খুলে ব্যবসা করা যাবে না এবং আবার ধরলে মামলা দেওয়া হবে– এমন নানা শর্তে আমি রাজি হইনি।

অবশ্য খানজাহান আলী থানার ওসি কামাল হোসেন দাবি করেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটক করা হয় না। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খানজাহান আলী থানার পর কেএমপি অধ্যাদেশে বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মী এসেছেন নগরীর লবণচরা থানা থেকে। দেখা গেছে, নগরীর লবণচরা থানায় ২০ নভেম্বর আজিজুল হাকিম, ১৫ নভেম্বর সাকিবুল হাসান সাকিম, আগের রাতে সাইমুন হাসানসহ গত ২০ দিনে মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে কেএমপি অধ্যাদেশে।

এ বিষয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।- সুত্র: সমকাল