Home জাতীয় মহাবিপর্যয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ, নতুন করে প্লাবিত হবিগঞ্জ

মহাবিপর্যয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ, নতুন করে প্লাবিত হবিগঞ্জ

8

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট||
সিলেট অঞ্চলে নতুন করে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এখন পানির নিচে। বিমানবন্দরের পর বন্ধ হয়েছে সেখানকার রেল যোগাযোগ। পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেকটাই বন্ধ মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ। দুর্গত এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী। পানির প্রবল স্রোতে মুহূর্তেই ভেসে যাচ্ছে বাড়িটি। সেই সাথে ভেসে গেলো কিছু মানুষের স্বপ্ন। কিছু মানুষের শেষ আশ্রয়। এমনই চিত্র এখন পুরো সিলেট জুড়ে।

জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিশ্বনাথ এবং ওসমানীনগরসহ জেলার সবগুলো উপজেলা এখন পানিতে টইটুম্বুর।

এমনকি শহরের অবস্থায় একইরকম। নগরীর উঁচু এলাকা হিসেবে পরিচিত মদীনা মার্কেট, সুবিদবাজার, বাগবাড়ি, বন কলাপাড়া, চৌহাট্টা।

সিলেট শহরের শহরের উঁচু উঁচু স্থান, পাহাড়ি এলাকাছাড়া অন্যান্য এলাকার ঘরবাড়িগুলোতে ঢুকে পড়েছে পানি। টিনশেডসহ একতলা বাড়িঘর ডুবে যাওয়া বহু মানুষ এখন আশ্রয়কেন্দ্রে।

আবার অনেকের সেই সুযোগও মেলেনি। শিশু-সন্তান নিয়ে ঘরবন্দি আছে অনেক পরিবার। তিন চার দিন হলো ঘরে ঢুকেছে পানি। চরম আতংকে কাটছে প্রতিটি দিন।

জীবন বাচাতে অনেকেই ঘর ছেড়েছেন। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে নৌকায়। প্রতিটি ঘরেই এখন হাঁটু আর কোমর পানি। একটি নৌকাই এখন তাদের তাদের একমাত্র চাওয়া।

চকির উপরে চকি কিম্বা ইট দিয়ে উঁচু করে ঘরের আসবাবপত্র বাঁচানোর চেষ্টা। চুলায়ও আগুন জ্বলছে না গেল কয়েকদিন। সব মিলেয়ে ভোগান্তির শেষ নেই বানভাসি মানুষগুলোর।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মুজিবুর রহমান নিজেই বলছেন, বন্যায় অনাহারে থাকা লোকজন এখন কেবল প্রাণে বাঁচতে চান। কিন্তু একটি নৌকা মেলানো তাদের কাছে এখন সোনার হরিণ।

তিনি জানান, কোন কোন উপজেলার প্রায় শতভাগ মানুষ পানিবন্দি। কেউ ত্রাণ চায় না, প্রাণে বাঁচতে চায়। কিন্তু তাদের উদ্ধারের জন্য নৌকা পাওয়া যাচ্ছে না।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নেই মোবাইলের নেটওয়ার্কও। পানিবন্দি জীবনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে বহু গুণ। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানকেও ফেলেছে চ্যালেঞ্জের মুখে।

সিলেট নগরীসহ ১৩ উপজেলায় মোট ১০ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। এই অবস্থায় নদীর পানির পানি কমার কোন লক্ষণ নেই। তারা বলছেন, সিলেট অঞ্চলে এমন বন্যা তারা আগে দেখেননি।

সিলেট অঞ্চলের বহু এলাকাতে বিদ্যুৎও নেই। অন্ধকারে আছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। সাব স্টেশনের পানি ওঠায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এলাকাবাসী বলছেন, এতো প্রবল স্রোত এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাবার পর পানি ঢুকেছে বাড়িঘরেও। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

এরইমধ্যে প্ল্যাটফর্ম পানিতে ডুবে যাওয়ায়, সিলেট রেলস্টেশন থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। আপাতত মাইজগাঁও থেকে চলছে ট্রেন।

দুর্গত এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে কাজ করছে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। তবে জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জের নিচু এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আগে থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে, সড়কপথে সুনামগঞ্জ শহরের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নেই বিদ্যুৎ। মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ।

তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়ক। নদী উপচে জেলা শহরের প্রতিটি বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়েছে পানি। কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি।

পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সড়কপথে জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারেই বন্ধ। একাধিক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও বৈদ্যুতিক খুঁটি তলিয়ে যাওয়ায় জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ আছে।

জেলার কোথাও কাজ করছে না মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক; ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ। কার্যত পুরো জেলা এখন সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন।

সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মুহম্মদ মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলা সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।

জলযানের সংকট আছে। ফলে বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সিলেট ও সুনামগঞ্জের পর এবার বন্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে হবিগঞ্জে। উজানের পাহাড়ি ঢল ও কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে কুশিয়ারা-খোয়াই-কালনীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়েছে।


এতে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ ও নবীগঞ্জ উপজেলার অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি জায়গায়।

নদ-নদীর পানি বেড়ে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর অংশে কালনী-কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ডুবে ও পাহাড়পুর এলাকার রাস্তা ভেঙে পানি হাওরে প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে।

আর নবীগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ উপচে রাধাপুর, ফাদুল্লাহ, পাহাড়পুর, পারকুল, দুর্গাপুর, উমরপুর গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিনহাজ আহমেদ শোভন বলেন, ‘টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুশিয়ারা-কালনী ও খোয়াই নদীর পানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নবীগঞ্জে বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে ও আজমিরীগঞ্জে রাস্তা ভেঙে পানি ঢুকছে। পানি বেড়েই চলেছে।