Home আঞ্চলিক চীন থেকে প্রেম, মেহেরপুরে বিয়ে: কাগজপত্রে মিলল রহস্য

চীন থেকে প্রেম, মেহেরপুরে বিয়ে: কাগজপত্রে মিলল রহস্য

12


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় থেকে প্রেম, আর সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে চীন থেকে মেহেরপুরে এসে স্থানীয় এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করেছেন এক চীনা নাগরিক। তবে দম্পতির উপস্থাপিত নথিপত্র, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়ায় ঘটনাটি ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন, আইনজীবী ও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানা গেছে, চীনের নাগরিক জাং ডং শেং, যিনি বর্তমানে নিজেকে মোহাম্মদ আলী নামে পরিচয় দিচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেহেরপুর পৌর এলাকার ঘোষপাড়ার বাসিন্দা শরিফ ড্রাইভারের মেয়ে কেয়া খাতুনের সঙ্গে পরিচিত হন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

কেয়া খাতুনের দাবি, প্রেমের টানে জাং ডং শেং প্রথমবার মেহেরপুরে এসে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে তিনি প্রায় ১৭ দিন শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। এরপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তারা চীনে যান এবং সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থান শেষে সম্প্রতি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন।


সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাং ডং শেং ভাঙা ইংরেজিতে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে কেয়া তাকে চীনা ভাষায় কথা বলতে বলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য, কেয়ার বিয়ে কিংবা চীনে যাওয়ার বিষয়টি তারা আগে জানতেন না। বুধবার রাতে ওই চীনা নাগরিককে নিয়ে কেয়া বাবার বাড়িতে আসেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। পরদিন সকালে তারা সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান।

পরে স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে তাদের অবস্থানের তথ্য পেয়ে সাংবাদিকরা মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিসপাড়ার একটি ভবনে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

দম্পতির দাবি, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তারা বৈধভাবে বিয়ে করেছেন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। তবে তাদের উপস্থাপিত হলফনামা, নিকাহনামা ও ম্যারেজ সার্টিফিকেটসংক্রান্ত এফিডেভিটে থাকা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

নথিতে নোটারি পাবলিক ও মেহেরপুর জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রূতশোভা মণ্ডলের নাম, সিলমোহর ও স্বাক্ষর রয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূতশোভা মণ্ডল বলেন, গত তিন বছরে তিনি কোনো চীনা বা অন্য কোনো বিদেশি নাগরিকের বিয়ের হলফনামা কিংবা সংশ্লিষ্ট নথি সম্পাদন করেননি। তার আশঙ্কা, তার নাম, সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

মেহেরপুর সদর উপজেলার নিকাহ রেজিস্টার নান্নু জানান, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকের বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংগ্রহ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তার ভাষ্য, এই দম্পতি চীনা দূতাবাসের কোনো বৈধ এনওসি দেখাতে পারেননি। ফলে কীভাবে বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়েও আইনি প্রশ্ন রয়েছে।

দম্পতি দাবি করেন, মেহেরপুরে আসার আগে তারা সদর থানাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কোনো আগাম তথ্য থানায় দেওয়া হয়নি।

দম্পতির উপস্থাপিত নথিতে উল্লেখ রয়েছে, গত ৩১ মার্চ তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেখানে বলা হয়েছে, জাং ডং শেং বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর মোহাম্মদ আলী নাম গ্রহণ করেন। নিকাহনামায় চার লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নথিগুলোর সত্যতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া, তারা তিন মাস চীনে অবস্থান করার দাবি করলেও সাংবাদিকদের কাছে পাসপোর্ট বা ভিসা প্রদর্শন করেননি।

বাংলাদেশ তথ্য ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি রফিকুল আলম বলেন, দুই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে করলে তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা সম্মান করা উচিত। তবে বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, অভিবাসন বিধি এবং বিয়ে নিবন্ধনের সব আইনি শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। নথি জালিয়াতি, তথ্য গোপন বা প্রতারণার প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করা ঠিক নয়।

এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দম্পতির দাবি, উপস্থাপিত নথিপত্র, আইনজীবীর বক্তব্য, নিকাহ রেজিস্টারের তথ্য এবং পুলিশের অবস্থানের মধ্যে যে অসঙ্গতিগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর প্রকৃত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। ফলে পুরো ঘটনাটি এখন তদন্তসাপেক্ষ।