-ফরিদ আহমদ দুলাল
আমাদের জীবনে বৈশাখ সমাগত; বৈশাখকে ঘিরে আমাদের আবেগের অন্ত নেই, নতুন বছরকে সাজিয়ে নিতে ফিবছর চলে বাঙালির নতুন বছরে পরিকল্পনার প্রস্তুতি। কিন্তু এ বছর আমাদের জীবনে বৈশাখ এসেছে নতুন এক সংকট-সংগ্রাম নিয়ে। সমস্ত বিশ্ব আজ মহাদুর্যোগের মুখোমুখি। প্রতিদিন সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ; এ মহামারি মোকাবিলায় মানুষ নিজেকে নির্জনবাসে গৃহবন্দি করে নিয়েছে; অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মানুষ যেন নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে গুহাবাসের জীবনে। যে বাঙালির বছর ধরে চলে উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়োজন। যেসব অনুষ্ঠানে সবাই মিলিত হয় প্রাণের আবেগে। ষড়ঋতুর বর্ষ পরিক্রমায় ঋতুচক্রের সাথে সঙ্গতি রেখে লোকবাংলার সেসব আয়োজন সুদীর্ঘ কাল ধরে আমাদের গ্রাম-গঞ্জে নিয়মিত সেসব আয়োজন হয়ে আসছে।
বাঙালির বর্ষপরিক্রমার প্রথম এবং প্রধান উৎসব ‘নববর্ষবরণ’। বঙ্গাব্দের সূচনায় বাঙালি নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আয়োজন করে নববর্ষবরণ উৎসব। আমাদের সমাজের মানুষের ধারণা বছরের প্রথম দিন ভালো কাটলে সারা বছর ভালো কাটবে। নববর্ষে একজন অন্যের বাড়িতে গেলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে আপ্যায়িত করে, মিষ্টিমুখ করায় এবং পরস্পরের সাথে কোলাকুলি করে। সাম্প্রতিক সময়ে নববর্ষ উপলক্ষে শহরে বৈশাখীমেলার আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন ইত্যাদি সাড়ম্বরে পালিত হলেও গ্রামের অনুষ্ঠানের আয়োজন ভিন্নমাত্রার। নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামে কবাডি খেলা, দাঁড়িয়াবাঁধা খেলা, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগ, নৌকাবাইচ, ষাঁড়ের লড়াই, ঘুড়ি উড়ানো ইত্যাদি খেলার আয়োজন হয়। গৃহস্থ বাড়িতে গৃহপালিত প্রাণীদের স্লোগান করানো হয়, কলকিতে রঙ লাগিয়ে গরু-ছাগলের গায়ে নকশা আঁকা হয় এবং ঘর-দুয়ার-উঠোন-আঙ্গিনা পরিষ্কার পরিপাটি করা হয়। নববর্ষ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা হালখাতার আয়োজন করে। হালখাতার প্রস্তুতি চলে দুদিন আগে থেকেই। দোকানপাট দু’দিন আগে থেকেই ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয় এবং দোকানের মালামাল পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি পুনর্মূল্যায়িতও হয় নববর্ষে। হালখাতার অনুষ্ঠানকে গ্রামে বলা হয় পুণ্যি। পুণ্যি অনুষ্ঠানে নিয়মিত ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। বাঙালির এসব সব আয়োজনে থাকে সম্মিলন; কিন্তু এবারের আয়োজন সবই সংকটাপন্ন। দুর্যোগ থেকে বাঁচতে আমরা সবাই আজ একা থাকার ব্রত নিয়েছি। নিঃসঙ্গতার ব্রতে সম্মিলনের অবকাশ কোথায়? বাস্তবতার নিরিখে দাঁড়িয়ে আজ বাঙালির নববর্ষ উদযাপন ভাবনা।
বর্ষবরণের আয়োজন ছাড়াও বর্ষপরিক্রমায় আমাদের গ্রামবাংলার নানা প্রান্তে আছে নানা আয়োজন। লক্ষ করলেই দেখা যাবে লোকবাংলার প্রতিটি আয়োজনের সাথে কৃষির একটা সংযোগ আছে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে গ্রামে গ্রামে মানুষ আম কাঁঠাল দুধ খৈ নিয়ে আত্মীয় বাড়ি যায়, বিশেষত মেয়ের বাড়ি যায় এবং নিজেদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে গ্রামে গ্রামে ভরা নদীতে আয়োজন হয় নৌকাবাইচ; এই প্রতিযোগিতা কোনো কোনো ব্যক্তি এবং বংশের জন্য সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভাদ্র মাসে মেয়েরা বাপের বাড়িতে নাইওর যায়। দীর্ঘদিন পর মেয়ের আগমন উপলক্ষে আয়োজিত হয় সামাজিক নানান উৎসব-অনুষ্ঠান। ভাদ্রে তালের পিঠা, কার্তিক শেষে মশা-মাছি তাড়ানো এবং নতুন ফসলের মঙ্গল কামনা। কার্তিকের শেষ দিন বাড়ি থেকে অশুভ তাড়াতে খড়ের ‘বুইন্দা’য় আগুন দিয়ে বাড়ির চারপাশে প্রদক্ষিণ করে খড়ের ‘বইন্দা’টি নিজের ধানি জমিতে পুঁতে দেয়া হয়। বুইন্দা নিয়ে প্রদক্ষিণের সময় চিৎকার করে বলা হয়- ‘বালা আয়ে বুড়া যায় মশা-মাছির মুখ পুড়া যায়’। মানুষের ধারণা এই ধোঁয়ার মাধ্যমে মশা-মাছি-অশুভ পতঙ্গ বিনাশ হবে এবং ক্ষেতে অধিক শস্য ফলবে। অঘ্রাণে নতুন ধান ওঠে কৃষকের ঘরে ঘরে, চলে নবান্নের উৎসব। রাতভর ঢেঁকিতে ধানভানা, আর ধানভানার গীত। ঢেঁকিতে ধান ভানার দৃশ্যটি এখন অবশ্য নিতান্তই বিরল। পৌষে পিঠা-পায়েশ তৈরির ধুম। মাঘে শীত সকালে নাড়ার আগুনে নিজেদের সেঁকে নেয়া। চৈত্রে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা- বান্নির মেলা-চরকগাছ ইত্যাদি। শীতের রাতে গ্রামে গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে বসে কিসসাপালা, পুঁথিপাঠ, গাইনের গীত আর কীর্তনের আসর। সব মিলিয়ে আনন্দ-বেদনায় কেটে যায় আমাদের গ্রাম-বাংলার জীবনের প্রত্যহিকতা।
বাঙালির জীবনে বৈশাখ প্রথমত উৎসবে; উৎসব নববর্ষবরণের, নববর্ষ বরণানুষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে যায় নানান উৎসব আয়োজন এবং অবশ্যই নববর্ষে চলে মিষ্টিমুখ। আগেই বলেছি লোকবাংলার বর্ষবরণ আর নগরসংস্কৃতির নববর্ষবরণের পার্থক্য নিয়ে। বাঙালির নাগরিক জীবনে নববর্ষে পান্তা-ইলিশ, পাটশাক, শুঁটকি ভর্তা (চ্যাপা শুঁটকি/ হিদল ভর্তা) সম্প্রতি খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে; যার সাথে লোকজীবনের সামান্য মিলও নেই; যে মিলটি সর্বত্র বিরাজমান তা হলো ‘মিষ্টিমুখ’। সামর্থ্য অনুযায়ী দেশজুড়ে বাঙালি নববর্ষে মিষ্টিমুখ করতে চায়। নববর্ষে বাঙালির মিষ্টি খাওয়ায় অভিন্নতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু আজকের এই করোনাকালে আমাদের নববর্ষ উদযাপন কী হবে? বছরের বাকি দিনগুলোই বা কী নিয়ে পাড়ি দেবে বাঙালি? আমাদের এক জীবনেই নববর্ষবরণ নিয়ে বেশ ক’বার সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি আমরা; সংকট যত গভীর হয়েছে, আমাদের শক্তি ততটাই প্রবল হয়েছে; এবারের সংকট ভিন্ন প্রকৃতির হলেও, সংকট সংকটই। এসব ভাবনাতেই আজকের আলোচনা ‘সংকটকালে নববর্ষ বরণ’।
ফাল্গুনে আমের বোল ফোটে, চৈত্রে ধরে কুঁড়ি; অগণন আমের কুঁড়িতে মুখরিত হয় আমবাগান। ফাল্গুন-চৈত্র পাখিদের মৌসুম, মিলনের মৌসুম। নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাখিরা নীড় রচনা করে, ডিম দেয়; অতপর বংশবৃদ্ধির জন্যে চলে মা-পাখির কোয়ারেন্টাইন। ফিবছর প্রকৃতির এই স্বপ্নকে বিপর্যস্ত করে বৈশাখী ঝড়; ঝরে পড়ে আমের কুঁড়ি, ভেঙে যায় নীড়, বিপন্ন হয় সম্ভবনা। বৈশাখী ঝড়ের তা-ব মোকাবিলা করেও গাছে গাছে আমের কুঁড়ি বড় হয়ে ওঠে, পাখিরা নিজেদের জীবনসংগ্রাম বাঁচিয়ে রাখে। নতুন সকালে নতুনের আবাহনে গাছে গাছে গেয়ে ওঠে পাখি। পৃথিবীর বর্তমান সংকট করোনাকাল মোকাবিলায় নতুন জীবনের প্রত্যয়ে বাঙালির সংগ্রামকে প্রকৃতির শিক্ষায় বাঁচিয়ে রাখতে হবে। প্রকৃতির শিক্ষায় স্তোত্র হয়ে বৈশাখ উদযাপনে বাঙালির আছে রবীন্দ্রনাথের অমোঘ বাণী। রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সেই গানের বাণী আমরা অন্তরে কতটা ধারণ করি সে প্রশ্নটি কখনো কি নিজেকে করেছি? কখনো কি নিজের ভেতরের অন্ধকারটি সরিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছি আমরা? না-কি গান গেয়ে পরক্ষণেই ভুলে গেছি তার মর্মকথা? করোনাকালের এ সংকটে আজ আরো একবার স্মরণ করতে চাই কবিগুরুর বৈশাখ আবাহন-
এসো হে বৈশাখ এসো এসো
তাপসনিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক ।।
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক ।।
মুছে যাক গ্লা, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক ।।
এ গান কেবল বৈশাখ বা নতুন বছরকে বরণ করবার স্তোত্রপাঠ নয়, বরং এ গান আমাদের জীবনের প্রাত্যহিকতাকে নবায়নের গান; এ গান তাই প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য সংস্কৃতির যে মাত্রা নির্ধারণ করে রেখে গেছেন, সে কথা আমাদের প্রাগ্রসর মানুষেরা বক্তৃতা-বিবৃতি আর পা-িত্যপূর্ণ প্রবন্ধে উচ্চারণ করেন, ব্যক্তিগত জীবনাচারে তা চর্চায় আনতে চান না সচেতনভাবেই। জীবনাচারে শুদ্ধতার চর্চা করলে যদি স্বার্থ বিঘ্নি হয়? হয়তো সে-ই তাদের ভয়! কিন্তু আজকের এই করোনাকালে রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীতেই আমরা খুঁজে নিতে পারি মুক্তির দিশা: আগামীর শুদ্ধজীবন প্রত্যাশায় নববর্ষবরণে আমি তাই আমন্ত্রণ জানাই ডিজিটাল বিশ্বের সব মিডিয়ায়-যোগাযোগ মাধ্যমে একযোগে বেজে উঠুক, “তাপসনিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক ।…”










































