Home আঞ্চলিক উপকূলীয় তিন জেলার ২৪০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ

উপকূলীয় তিন জেলার ২৪০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ

11

খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।

কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ গ্রামের তহশিল অফিসের পার্শ্ববর্তী বেড়িবাঁধ গত ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস জলোচ্ছ্বাসে জরাজীর্ণ হয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ওই বেড়িবাঁধের একটি অংশে মাটি বালুর বস্তা দিয়ে কোনোমতে মেরামত করে। আরেকটি অংশে কোনো সংস্কার করা হয়নি। গত ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪-ফুট বৃদ্ধি পায়। জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি পানির চাপে ওই বেড়িবাঁধের অবস্থা এখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শুধু এই একটি স্থানেই নয়; উপকূলীয় খুলনা, সাতক্ষীরা বাগেরহাট জেলার অনেক স্থানেই বেড়িবাঁধ এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গত ডিসেম্বর কয়রার হরিহরপুর লঞ্চঘাটের পূর্ব পাশে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হরিহরপুর গাতিরঘেরী গ্রামের ২০০ পরিবার এখন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম গোলাম মোস্তফা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুস্ক মৌসুমে যখন বেড়িবাঁধ মেরামত করার সুযোগ থাকে তখন পানি উন্নয়ন বোর্ড তা মেরামত করে না। এর ফলে কয়রার অনেক স্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কয়রার উত্তর বেদকাশি ইউপি চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, হরিহরপুর লঞ্চঘাট এলাকায় ঠিকাদার দায়সারাভাবে বেড়িবাঁধ মেরামত কাজ শেষ করেন। কারণে গত ডিসেম্বর আবারও ভেঙে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট সাতক্ষীরা জেলায় বেড়িবাঁধ রয়েছে মোট হাজার ৯১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৪০ কিলোমিটার বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ষাটের দশকে মাটি দিয়ে তৈরি এই বেড়িবাঁধ ছিল ১৪ ফুট উঁচু ১৪ ফুট চওড়া। এখন এই ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের উচ্চতা চওড়ার অর্ধেকও অবশিষ্ট নেই। অর্থাভাবে দীর্ঘদিনেও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করতে না পারায় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ষাটের দশকে তৈরি এই বেড়িবাঁধের বেশিরভাগই দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং নিম্নচাপ, লঘুচাপ, আমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে গ্রামে পানি ঢোকা ঠেকাতে পারছে না বাঁধগুলো।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, তিন জেলার বেড়িবাঁধের উচ্চতা প্রশস্ততা কম এবং এগুলোর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনেও ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো লবণাক্ত মাটি দিয়ে তৈরি। উপকূলীয় এলাকার অধিকাংশ নদীর পানিও লবণাক্ত। লবণাক্ত পানি বেড়িবাঁধের মাটির বন্ডিং দুর্বল করে ফেলে। অতিরিক্ত জোয়ারের পানির চাপে বাঁধের মাটি ধুয়ে যায়। এছাড়া বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে চিংড়ি ঘেরে লবণপানি তোলার কারণেও বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে গেছে। কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, কয়রার কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া কয়রা নদীতে পলি পড়ে নাব্য কমেছে। ফলে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে। এছাড়া প্রতিবছর গড়ে প্রায় দুই বার ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানছে। তখন জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪-ফুট বৃদ্ধি পায়। কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে যে বেড়িবাঁধ রয়েছে তা দিয়ে উপকূলীয় জনপদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। নতুন করে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। উপকূলের বাসিন্দারা জানান, দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে বিভিন্ন সময় ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। এছাড়া নিম্নচাপ এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে বাঁধ উপচিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। এর ফলে উপকূলীয় খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা বটিয়াঘাটা; সাতক্ষীরার শ্যামনগর আশাশুনি এবং বাগেরহাটের শরণখোলা মোংলার কয়েক লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাউবো খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সফি উদ্দিন বলেন, অনেক স্থানেই বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪/১নং পোল্ডার মেরামতসহ দুটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। সেগুলোর নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। দুই-এক মাসের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার পুনর্বাসনের কাজ আগে করা হবে। এছাড়া ২০, ২১, ২২ ৩১নং পোল্ডারের বেড়িবাঁধ মেরামতের জন্য প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। প্রকল্প প্রণয়ন হলে অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।-সমকাল