০ খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাবে টানা তিন দিনের অতি জোয়ারে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকা। অনেক জেলায় নড়বড়ে বেড়িবাঁধগুলো ভেঙে ও উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে অসংখ্য গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে সবজি, লবণসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত। ভেসে গেছে চিংড়িঘের ও মাছের খামার-পুকুর। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ার পাশাপাশি ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ। অনেকে রান্না করার জায়গাও পাচ্ছে না।
খুলনা : জেলায় ২০টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় অর্ধশত গ্রাম। কয়রা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে অন্তত ১১টি স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে। ১৭ স্থানে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। পাইকগাছা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে সতিটি স্থানের বাঁধ ভেঙে গেছে। ভেসে গেছে ১০০ মিটার বেড়িবাঁধ। কাঁচা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ কিলোমিটার। দাকোপ উপজেলায় তীলডাঙ্গা ইউনিয়নের সোনার বাংলা কলেজের পাশের সøুইসগেট এলাকার বাঁধ ভেঙে গেছে।
সাতক্ষীরা : শ্যামনগর ও আশাশুনির ১০টি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ও মৎস্যঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কমপক্ষে ২২টি স্থানে উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙে এবং ৩৪টি স্থানে উপচে পড়া পানিতে জেলাব্যাপী প্লাবিত হয়েছে কমপক্ষে ৬০টি গ্রাম। ভেসে গেছে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার মৎস্যঘের। শ্যামনগরে ৯৫০ হেক্টর জমির দুই হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে। টাকার হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি টাকা। অন্যদিকে আশাশুনির ১ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমির ২ হাজার ৫৬০টি মাছের ঘের ভেসে গেছে। টাকার হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
পটুয়াখালী : উচ্চ জোয়ারের পানিতে জেলায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হালিম সালেহী জানান, নতুন এবং পুরনো মিলিয়ে পটুয়াখালী ও কলাপাড়া এই দুই জোনের আওতায় ৫৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ জানান, ৭ হাজার ৮৫টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মাছ, পোনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নিয়ে ৫৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কক্সবাজার : গত দুদিনে কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় আড়াই হাজারেরও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে পানের বরজ, শাকসবজি ও আউশের বীজতলা। জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, উপজেলাগুলো থেকে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। দুদিনের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যাবে।
সেন্টমার্টিন্স দ্বীপের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ জানান, জোয়ারের তান্ডবে দ্বীপের জেটিটি বিধ্বস্ত হয়েছে। জেটির পন্টুন ভেঙে গেছে। দ্বীপের বাড়িঘর ও পর্যটন রিসোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার গোস্বামী জানান, উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ৫৬টি অংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার মধ্যে ১৪টি পয়েন্টে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, চারটি পয়েন্টে পুরোপুরি বাঁধ ভেঙে গেছে। সব মিলিয়ে সাড়ে ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহেশখালী, মাতারবাড়ী ও ধলঘাট এলাকায় আধা কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।
অন্যদিকে কক্সবাজারে লবণ ও চিংড়িঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেড় শতাধিক চিংড়ি প্রকল্প প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে ১৬ কোটি টাকার মাছ ও ২ হাজার ৯৬ টন লবণ।
বাগেরহাট : ইয়াসের প্রভাবমুক্ত হওয়ার আগেই বাগেরহাটের রামপালে জোয়ারের পানিতে গ্রামরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ ও স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমসহ শত প্রচেষ্টায়ও রক্ষা হয়নি বাঁধটি। বৃহস্পতিবার দুপুরে জোয়ারের পানির তোড়ে ভেঙে যায় বগুরা নদীতীরের রামপাল উপজেলার হুড়কা গ্রামরক্ষা বাঁধটি। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় হুড়কা গ্রামের দুই শতাধিক মৎস্যঘের। সঙ্গে প্লাবিত হয় শখানেক বাড়িঘর।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল বলেন, রামপাল উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ মৎস্য চাষের ওপর নির্ভরশীল। ঘের ব্যবসায়ীদের রক্ষায় এখানে টেকসই বেড়িবাঁধ দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল বাতাসে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সুন্দরবনের ওপর দিয়ে পাঁচ-ছয় ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে কয়েকটি জলযান, ওয়াচ টাওয়ার, গোলঘর, রাস্তা, ফুটলেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে ডুবে মারা গেছে অন্তত চারটি হরিণ।
জেলায় দুই সহস্রাধিক মৎস্যঘের ভেসে গেছে। মঙ্গলবার রাত ও বুধবার জোয়ারের পানিতে এসব ঘেরের পাড় ভেঙে এবং পাড় উপচে পানি যায়। যার ফলে চাষিদের কয়েক কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, রামপাল, মোংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ উপজেলার ২ হাজার ৯১টি মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে চাষিদের ১ কোটি ৫১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তবে ঘেরের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে দাবি করেছেন জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন।
বরিশাল : ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি দেখেনি বরিশাল জেলার মানুষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্বপ্রস্তুতি এবং জনসাধারণ সচেতন হওয়ায় এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাত-পরবর্তী সরেজমিন পরিদর্শন শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ভোলা : বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৫০টি পয়েন্টে সাড়ে ১৫ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ মিটার সম্পূর্ণ এবং ১৫ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এসব পয়েন্টে জোয়ার এলে ফের প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে আতঙ্কিত উপকূলের মানুষ।
ঝালকাঠি : সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতীরের প্রায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে মাছের ঘের তলিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মাৎস্য বিভাগ।
বরগুনা : জেলার বিভিন্ন স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে লোকালয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। এতে জেলার ফসল ও মাছের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের দাবি, সিডরের মতো সুপার সাইক্লোনের পর দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইয়াসে তাদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
পিরোজপুর : বুধবারের ভরা পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, সেই সঙ্গে কয়েক ফুট উচ্চতায় প্লাবিত হয় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। এতে দুর্ভোগের মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষ। বুধবার রাতেও দমকা হাওয়ার সঙ্গে বেশিরভাগ সময়ে আকাশ ছিল মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টিও হয়েছে মাঝে মাঝে। জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি উপজেলায় ১৬৭ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা, ৭ হাজার ৩১৮ হেক্টর আবাদি জমি, ১ হাজার ৩৩৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত, ১৪১ হেক্টর পানের বরজসহ ২১২ হেক্টর বিভিন্ন রবিশস্যের ক্ষেত সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমএ বারী জানান, জোয়ারের পানিতে ডুবে যাওয়ায় ৫৯৬ হেক্টর জলাশয়ের ২ হাজার ১৫৭টি ঘের-পুকুর তলিয়ে পুকুর ও ঘেরের সব মাছ কমবেশি বের হয়ে গেছে।
ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) : উপজেলায় ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও দুই হাজার বাড়িঘরসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০টি গ্রাম তলিয়ে যাওয়ার কারণে দুই হাজার কাঁচা ও আধা কাঁচা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।











































