ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এর আগে গত শুক্রবার বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভের সময় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এলাকায় একজন নিহত হয়েছেন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে নন্দনপুর বাজার এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি’র সঙ্গে মোদি বিরোধী আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দু’জনের মৃত্যু হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তবে হাসপাতালে আনার আগেই তাদের মৃত্যু হয়। তিনজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ রানা নুরুস শামস জানান, সন্ধ্যার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাউসার মিয়া ও জোবায়ের নামে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় মাদ্রাসাছাত্র ও স্থানীয়দের বিক্ষোভ মিছিল থেকে পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়েছে। এতে ক্যাম্পে থাকা ২৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গতকাল শনিবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আহত পুলিশ সদস্যদের নাম জানা যায়নি। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেলে অরুয়াইল বাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন মাদ্রাসার ছাত্ররা। এতে স্থানীয় বাসিন্দারাও অংশ নেন। পরে মিছিল থেকে অরুয়াইল পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা পুলিশ সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এতে অন্তত ২৫ পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ হামলাকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সরাইল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন জানান, বিক্ষোভ মিছিল থেকে হঠাৎ করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এর আগে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে গত শুক্রবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে আশিক (২০) নামের এক তরুণ নিহত হয়েছেন।
জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ আশিক শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে বিকেলে জেলা শহরের কাউতুলীতে মাদ্রাসা ছাত্রদের বিক্ষোভে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মাদ্রাসা ছাত্ররা হাসপাতাল থেকে নিহতের লাশ নিয়ে শহরের প্রধান সড়কে মিছিল বের করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আরিফুজ্জামান হিমেল জানান, জরুরি বিভাগ থেকে মৃত্যু ঘোষণা করার পর লাশটি হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় বিক্ষুব্ধরা।
এর আগে বিকেল থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন শহরের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা ও জামিয়া সিরাজুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্ররা। বিকেল ৪টার দিকে তারা রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে তাদের দখলে নেন। এ ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ওসি আব্দুর রহিম।
এর আগে গত শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় শহরের প্রধান সড়ক টিএ রোডে মাদ্রাসা ছাত্ররা ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। এ সময় প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেল স্টেশনের সিগন্যাল, মাস্টার রুম, কন্ট্রোল রুমসহ রেল কর্মকর্তাদের কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয় এ সময়। সিগন্যাল বক্স ভেঙে ফেলায় ঢাকার সাথে সিলেট ও চট্টগ্রামের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
হাটহাজারীতে চারজন নিহত : চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে গুলিতে হেফাজতে ইসলামের কমপক্ষে চার কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে আরো অর্ধশত হেফাজত কর্মী ও সাধারণ মুসলি। তাদের মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ। গত শুক্রবার বাদ জুমা হেফাজতের কর্মী এবং মুসলিরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে এই সংঘর্ষ হয়।
হেফাজতের নেতারা অভিযোগ করেছেন পুলিশ বিনা উস্কানিতে শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছে। তবে পুলিশের দাবি মিছিলকারীরা থানায় হামলা করায় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছে। পুলিশের গুলি ও লাঠির আঘাতে আহত অন্তত ১০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তাদের মধ্যে গুলিতে আহত চারজনকে চমেক হাসপাতালের চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। চমেক হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ আরো চারজনকে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মিছিলকারীরা আকস্মিক থানায় ভবনে হামলা করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কাজ করেছে। কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমিন বলেন, বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা থানা ছাড়াও উপজেলা ভূমি অফিস, ডাক বাংলোসহ আরও কয়েকটি সরকারি অফিসে হামলা করে ভাঙচুর করেছে। তারা ভ‚মি অফিসে আগুন দেওয়ারও চেষ্টা করে।
বায়তুল মোকাররম এলাকা রণক্ষেত্র : জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মুসলিদের সঙ্গে পুলিশ, আ’লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ঘের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পরপরই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দফায় দফায় বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে সংঘর্ষ। ব্যাপক সংঘর্ষ হয় দক্ষিণ গেটেও। এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ শতাধিক মুসলি আহত হয়েছেন। বিকেল ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষে কার্যত পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। বিকেল পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালে আহত অন্তত ৭০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে আটজন বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক।
ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বাচ্চু মিয়া বলেন, বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষের ঘটনায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ঢামেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। কয়েকজন ভর্তি রয়েছেন তার মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
যাত্রাবাড়ীতে সড়ক অবরোধ : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ যাত্রাবাড়ীর আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। গত শুক্রবার রাতে এ তথ্য জানান যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম কাজল
আজ হরতাল হেফাজতের : ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আজ রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ। শুক্রবার রাত ৮টায় রাজধানীর পুরানা পল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আবদুর রব ইউসুফী এই ঘোষণা দিয়েছেন।
– বিশেষ প্রতিনিধি









































