মিলি রহমান।।
অনেকেই এসিড রিফ্লাক্স আর গ্যাস্ট্রাইটিসকে (যা আমরা সাধারণ ভাষায় গ্যাস্ট্রিক বলি) একই সমস্যা মনে করেন। তবে এ দুটি কিন্তু পেটের দুটি ভিন্ন জায়গার সমস্যা।
চলুন, জেনে নিই এগুলোর পার্থক্য সম্পর্কে———————————————————————————————————–
এসিড রিফ্লাক্স : এটি মূলত খাদ্যনালির সমস্যা। পাকস্থলীর এসিড যখন ভুল পথে ওপরের দিকে উঠে খাদ্যনালি বা গলায় চলে আসে, তখন তাকে এসিড রিফ্লাক্স বলে। আমাদের খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি বিশেষ মাংসপেশির রিং বা কপাটিকা থাকে।
এর কাজ হলো খাবার নিচে নামার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া, যাতে পেটের এসিড ওপরে উঠতে না পারে। খাওয়া শেষ করেই শুয়ে পড়লে, ধূমপান করলে বা অতিরিক্ত পেট ভরে খেলে এই কপাটিকাটি ঢিলে হয়ে যায়। ফলে পাকস্থলীর এসিড উল্টো পথে খাদ্যনালি ও গলার দিকে চলে আসে। এ ছাড়া স্থূলতা (অতিরিক্ত ওজন), গর্ভাবস্থায় বা আঁটসাঁট পোশাক পরলে পেটের ভেতরে চাপ বাড়ে, যা এসিডকে জোর করে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়।
চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবার সহজে হজম হতে চায় না, ফলে পাকস্থলী দীর্ঘক্ষণ পূর্ণ থাকে এবং এসিড ওপরের দিকে উপচে পড়ে। এসিড রিফ্লাক্স যখন একটি সাময়িক সমস্যা থেকে বের হয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও অনিয়ন্ত্রিত রূপ নেয়, তখন তাকে জিইআরডি বলা হয়।
গ্যাস্ট্রাইটিস (গ্যাস্ট্রিক) : এটি পাকস্থলীর নিজস্ব সমস্যা। পাকস্থলীর ভেতরের প্রতিরক্ষামূলক আস্তরণে ঘা বা প্রদাহ হলে তাকে গ্যাস্ট্রাইটিস বলে। আমাদের পাকস্থলীতে শক্তিশালী এসিড (হাইড্রোক্লোরিক এসিড) তৈরি হয় খাবার হজম করার জন্য। কিন্তু পাকস্থলী নিজেকে এই এসিড থেকে রক্ষা করার জন্য ভেতরের দেয়ালে একটি পাতলা শ্লেষ্মা বা মিউকাস আস্তরণ তৈরি করে রাখে। যখন এই প্রতিরক্ষামূলক আস্তরণটি ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে যায়, তখনই পাকস্থলীর দেয়ালে প্রদাহ বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
এসিড রিফ্লাক্সের লক্ষণ
- বুক ও গলার ভেতর জ্বালাপোড়া করা।
- মুখে টক বা তিতা পানি উঠে আসা।
- গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি বা গিলে খেতে কষ্ট হওয়া।
- রাতে শুইতে যাবার সময় বা খাওয়ার পর ঝুঁকে বসলে সমস্যা বেড়ে যাওয়া।
গ্যাস্ট্রাইটিসের (গ্যাস্ট্রিক) লক্ষণ
- পেটের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি হওয়া।
- সামান্য খেলেই পেট ভরে যাওয়া বা পেট ফাঁপা অনুভব করা।
- বমি বমি ভাব হওয়া বা ক্ষুধা কমে যাওয়া।
- এসিড রিফ্লাক্স ও গ্যাস্ট্রাইটিস (গ্যাস্ট্রিক) প্রতিহত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা।
খাওয়ার নিয়ম : একবারে পেট ভরে ভারী খাবার না খেয়ে সারা দিনে অল্প অল্প করে ৪-৫ বার খান। এতে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
- অতিরিক্ত তেল, মশলা ও ভাজাপোড়া খাবার।
- ক্যাফেইন (চা, কফি) ও কার্বনেটেড সফট ড্রিংকস।
- টক জাতীয় ফল (লেবু, তেঁতুল), টমেটো ও অতিরিক্ত চকলেট।
- কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন।
হজমবান্ধব খাবার : ডাবের পানি, ওটস, কলা, শসা, এবং পর্যাপ্ত পানি (তবে খাওয়ার মাঝামাঝি সময়ে বেশি পানি না খেয়ে খাওয়ার ২০-৩০ মিনিট পর খাওয়া ভালো)।
খাওয়ার পরপরই না শোয়া : রাতে বা দিনে খাওয়ার অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে এসিড সহজেই খাদ্যনালিতে উঠে আসে।
ঘুমানোর পজিশন : রাতে ঘুমানোর সময় মাথার দিকটি (বালিশ বা বিছানার মাথার অংশ) শরীর থেকে অন্তত ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উঁচু রাখুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা : পেটে অতিরিক্ত চর্বি থাকলে তা পাকস্থলীতে চাপ সৃষ্টি করে এসিড রিফ্লাক্স বাড়ায়। তাই সুষম ওজন বজায় রাখুন।
আঁটসাঁট পোশাক এড়ানো : পেটে অতিরিক্ত চাপ দেয় এমন টাইট বেল্ট বা আঁটসাঁট জামাকাপড় পরা এড়িয়ে চলুন।
ধূমপান ও অ্যালকোহল ত্যাগ : ধূমপান ও অ্যালকোহল পাকস্থলীর কপাটিকা শিথিল করে দেয়, ফলে এসিড সহজে ওপরে উঠে আসে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
যদি নিয়ম মেনে চলার পরেও সপ্তাহে ২ দিনের বেশি বুকজ্বালা বা পেটে তীব্র ব্যথা থাকে, গিলতে সমস্যা হয়, কিংবা মল কালো হয় তবে দেরি না করে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নিন।









































