Home কলাম বঙ্গবন্ধুকে বুকের ভেতর রাখাটা শুধু জরুরিই নয়, বিকল্পহীন

বঙ্গবন্ধুকে বুকের ভেতর রাখাটা শুধু জরুরিই নয়, বিকল্পহীন

611

বাঙালি জাতির জন্য অনন্য অনুভবের দিন আজ, কারণ ১৯২০ সালের আজকের এই দিনে সৃষ্টি হয়েছিল ইতিহাসের। জন্ম হয়েছিল এক স্ফূলিঙ্গের, যা ক্রমশ বিকশিত হয়ে রূপ নিয়েছে অগ্নিপুরুষে। সেই অগ্নিপুরুষ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকী। আজকের এই শুভ দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি।

তাঁর মোহন বাঁশির সুরে মুক্তির সংগ্রামে জেগে উঠেছিল নিষ্পেষণে কোণঠাসা এক জাতি। নিজের জীবনের রঙিন সব ক্ষণ মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। প্রতিবাদে-সংগ্রামে, প্রেরণায় হয়ে উঠেছিলেন একটি জাতির অভিভাবক, কর্ণধার। পিতার মতোই জাতিকে বুকে আগলে তৈরি করেছিলেন স্বাধীনতার জন্য। পিতার মতোই বজ্রকঠোর সাহসে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাধীনতার।

মুজিব তার পূর্বপুরুষদেরই গড়ে তোলা গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। এ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বাবার কাছে গোপালাগঞ্জ পাবলিক স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন। এর পেছনে একটা ঘটনা আছে। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘একবার বর্ষাকালে নৌকা করে স্কুল থেকে ফেরার সময় নৌকাডুবি হয়ে যায়। আমার আব্বা খালের পানিতে পড়ে যান। এরপর আমার দাদি তাকে আর ওই স্কুলে যেতে দেননি। একরত্তি ছেলে, চোখের মণি, গোটা বংশের আদরের দুলাল, তার এতটুকু কষ্ট যেন সকলেরই কষ্ট!’

চল্লিশের দশকে, যখন ‘শের-এ-বাংলা’ ফজলুল হক মুসলিম লীগ ত্যাগ করেন, নেতা ও কর্মীরা তখন বেশ চটা। রাতের বেলার ঘরোয়া আলোচনায় বাবার কাছে হক সাহেবকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন মুজিব। তাঁর বাবা বলতেন, ‘বাবা যাই করো, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু করিও না। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।’ মুজিব বুঝতে পারছিলেন, ফজলুল হক এমনি এমনি শের-এ-বাংলা হননি, বাংলার মাটিই তাঁকে ভালবেসে ফেলেছিল। শেখ মুজিব এর থেকে একটা দামি শিক্ষা পেয়েছিলেন। কেন পাকিস্তান, কী তাঁদের আসল লক্ষ্য-তার একটা দিশা মিলেছিল।

একটা দেশকে মুক্তির লড়াইয়ের জন্য তৈরি করা সহজ কথা নয়। পাকিস্তানের জন্মের পর যে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয় পূর্ব পাকিস্তানে, এক হাতে তার জট ছাড়াতে ছাড়াতে, আর এক হাতে সেই জটিলতাকে মূলধন করে একটা বিস্ফোরক আন্দোলন তৈরি করার কাজটা সহজ ছিল না সেদিন। বাংলাদেশ তৈরির লড়াইকে গোটা বিশ্বের কাছে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন হিসেবে না দেখিয়ে, একটা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে দেখানো সামান্য কাজ ছিল না। সেই অসাধ্যকেই বস্তবে রূপ দিয়েছিলেন বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৭ সাল থেকেই শেখ মুজিবের রাজনীতি উদ্ভাসিত হতে থাকলো স্বমহিমায়। পাকিস্তানিদের কাছে যে এদেশের মানুষ শোষিত হচ্ছে, বাংলা সংস্কৃতি যে বিপদাপন্ন, বুঝতে সময় লাগেনি তাঁর। অনিবার্যভাবেই রুখে দাঁড়ালেন তিনি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেমন দেখতে পেল শেখ মুজিবুরের তর্জনীর ঝলক, বাংলার জনগণও যেন টের পেল তাদের মুক্তিদাতার আগমনী বার্তা। বাঙালির এই মহানায়কের আবির্ভাব পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির চক্ষুশূল হয়ে উঠলো। আর সে কারণেই শেখ মুজিবকে অত্যাচার নির্যাতন কোরে বারবার নিক্ষিপ্ত করতে থাকলো কারগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তারিখটি লাল কালিতে রাঙিয়ে রাখার মতো। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের একটি নতুন নাম দিলেন-বাংলাদেশ। বললেন, ‘এ দেশের বুক থেকে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা থেকে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সাথে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। জনগণের পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি আজ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।’

১৯৫৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের পরিবর্তে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন নেমে আসার পর শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদী নেতা-অকুতোভয় প্রতিবাদী। নিয়ে এলেন তাঁর ছয়দফা দাবি। সারা দেশ প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল তাঁর এই কর্মসূচিতে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের গণপরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একাত্তরের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা-ভিত্তিক সংবিধানে অনুগত থাকার শপথ নিলেন। বিপদ বুঝে একাত্তরের ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গণপরিষদ স্থগিত করে দিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনও কথাই বললেন না। ঢাকার রাস্তায়, অলিতে-গলিতে তখন নেমে এসেছে মানুষের ঢল।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু মুক্তিকামী বাঙালির উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিলেন। সেই কালজয়ী ভাষণ যে শুনেছে তারই শরীরে বয়ে গেছে বিদ্যুৎ প্রবাহ। সে ভাষণে ছিল এ দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের অকথিত বাণীর প্রকাশ, তাদের চেতনার নির্যাস, বক্তব্যের অবিসংবাদিত আন্তরিকতা! বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এই আন্তরিকতার বন্ধন গড়ে উঠেছিল বলেই তো শত্রুদেশে বন্দি থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রেরণা ছিল সক্রিয়।

২৫ মার্চ ১৯৭১। অপারেশন সার্চলাইটের মধ্য দিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। শুরু করে শতাব্দীর অন্যতম গণহত্যা। সে গণহত্যাকে প্রতিরোধ যুদ্ধে রূপান্তর করতেও সময় নেয়নি মুক্তিকামী বাঙালি। মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষিত সৈনিক ছিলেন না। তাঁদের না ছিল অস্ত্র, না ছিল যুদ্ধের উপযোগী সাজসরঞ্জাম, জামাকাপড়, খাবার-ওষুধ-আশ্রয়। পায়ে হেঁটে, কাদাপানি পেরিয়ে, হেমন্তে-শীতে খালি গায়ে সাধারণ বাঙালির এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ সম্ভব হয়েছে তাঁদের প্রাণের নেতা শেখ মুজিবের প্রেরণায়। তাঁর নাম ধরেই উচ্চারিত হতো যুদ্ধের সেøাগান।

দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে বাংলার মাটি রক্তে ভাসিয়ে, অসংখ্য প্রাণের মূল্যে, লক্ষ লক্ষ নারীর মর্যাদাহানির পরে সফল হলো মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। প্রথম প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী দেখলেন মুজিব? দেখলেন, সাম্প্রদায়িক দল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এ ধারে ও ধারে। এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এ এক নতুন পরিস্থিতি। ইসলামি দলগুলি আমার বিরুদ্ধে গোপন প্রচার করছে, শয়তানের হাসি হাসছে। দেখেশুনে মনে হয়, তাজউদ্দিনের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভোলা বা মনপুরায় গিয়ে ছোট্ট ঘর বানিয়ে থাকি।’ তবে কি ব্যর্থ  হলো এত যন্ত্রণাভোগ, এত দাম দেওয়া?

তবু আশা রাখেন মুজিব। স্বদেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে হাত দিলেন। বাঙলার মানুষের মুখে দু’বেলা দুমুঠো ভাত তুলে দিতে শুরু করলেন প্রাণান্তকর পরিশ্রম। পঁচিশে মার্চ, উনিশ শো একাত্তর থেকে যে দীর্ঘ সময়টি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, সে সময় তিনি এক মুহূর্তের জন্যে স্বদেশভূমিকে ভোলেননি, বরং বুকের কাছে আঁকড়ে ধরেছেন নিজের দেশ, পতাকা আর বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়া চেতনাকে।

বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালবেসেছেন, দেশের মানুষকে ভালবেসেছেন। অর্থ লোভ তাঁকে ছোঁয়নি কখনো। দেশের ভালোবাসার কাছে অর্থের মোহ তুচ্ছ ছিলো তাঁর কাছে। এমন নেতা কি আর জন্মাবে কখনো এদেশে? না, বাঙালির মুক্তিদাতা হয়ে একবারই এসেছিলেন মহানায়ক। সামরিক শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায়, স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরামহীন অপপ্রচারে ধর্মান্ধ উন্মাদরা ইতিহাস থেকে বারবার মুছে ফেলতে চেয়েছে বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতার নাম। পারেনি। জীবিত মুজিবকে হত্যা করেও তাদের আক্রোশ মেটেনি। এখনও হামলা চালায় বঙ্গবন্ধুর প্রাণহীন ভাস্কর্যে। মানুষের হৃদয়ে যার বাস, মানুষের কাছ থেকে তাকে কি কখনো বিচ্ছিন্ন করা যায়?

স্বাধীনতা প্রাপ্তির চার বছর যেতে না যেতেই যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, তাদের জানা ছিল না, পুরো বাংলা আর বাংলাদেশটাই ধারণ করে রয়েছে শেখ মুজিবের অবয়ব, তার অস্তিত্ব কখনও মুছে ফেলা সম্ভব নয়। দিন যত যাবে, বাংলা আর বাঙালির কাছে ততই মহান হয়ে উঠবেন তাদের প্রাণপুরুষ। বাংলার আত্মপরিচয়ের ঠিকানা জানার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বুকের ভেতর রাখাটা শুধু জরুরিই নয়, বিকল্পহীনও। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ-মুজিববর্ষে, বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনে-এ প্রত্যাশাই উচ্চারিত হোক হৃদয়ে হৃদয়ে। সারা বাংলার মানচিত্র জুড়ে।

নাজমুল হক লাকি