Home জাতীয় ঢাকা-ভাঙ্গা এঙ্প্রেসওয়েতে ২১৮ দুর্ঘটনায় ঝরেছে ১৬৯ প্রাণ

ঢাকা-ভাঙ্গা এঙ্প্রেসওয়েতে ২১৮ দুর্ঘটনায় ঝরেছে ১৬৯ প্রাণ

4


ঢাকা অফিস
রাজধানী থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো ফেরির জন্য। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই চিত্র বদলে গেছে। কয়েক ঘণ্টার পথ এখন অনেক কম সময়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব।
কিন্তু যাতায়াতের এই স্বস্তির বিপরীতে ঢাকা-ভাঙ্গা এঙ্প্রেসওয়ে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। দ্রুতগতির যানবাহন, পাল্লা দিয়ে ওভারটেকিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা আর নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। কোনো ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে একাধিক মানুষের, কোনো দুর্ঘটনায় সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ছেন কেউ। স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছরে এই ঢাকা-ভাঙ্গার (পদ্মা সেতু-ভাঙ্গা) এঙ্প্রেসওয়েতে ২১৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬৯ জন। আহত হয়েছে ১১২ জন। দুর্ঘটনাগুলোতে ৮৪টি মামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২৮ জন পুরুষ, ৩৩ জন নারী ও ৮ জন শিশু।
দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। এঙ্প্রেসওয়েতে নির্ধারিত গতিতে চলাচলের পরিবর্তে অনেক যানবাহনকে একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিতে দেখা যায়। সামনে থাকা গাড়িকে অতিক্রম করতে গিয়ে পাশের লেন দখল, হঠাৎ ব্রেক এবং নিরাপদ দূরত্ব না রাখার কারণে তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষের পরিস্থিতি। কোনো গাড়ি বিকল হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে পড়লেও পেছন থেকে আসা দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য তা হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী ফাঁদ। পাশাপাশি এঙ্প্রেসওয়েতে গতি নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
এর ভয়াবহ উদাহরণ ২০২৩ সালের ১৯ মার্চ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এঙ্প্রেসওয়েতে ইমাদ পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে চালকসহ ২০ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় স্থানীয়দের। কিন্তু এরপরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কুতুবপুরের বাসিন্দা সাকিব হাসানের অভিযোগ, এঙ্প্রেসওয়েতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে আগের মতো কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ে না। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে কুতুবপুরেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২০ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এখনো অনেক যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলে। আগের মতো পুলিশের তৎপরতা দেখা যায় না। নিয়মিত স্পিড গান ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বা আইনি কঠোর প্রয়োগ করলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
শুধু গতিই নয়, যাত্রী ওঠানামার অনিয়মও এই সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শিবচরের পাঁচ্চর গোলচত্বর এলাকায় অনেক পরিবহনকে যাত্রী তোলার জন্য এঙ্প্রেসওয়ের পাশে থামতে দেখা যায়। অথচ যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য সেখানে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। সেটি যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় যাত্রীদের এঙ্প্রেসওয়ের রেলিং টপকে গাড়িতে উঠতে হচ্ছে। এতে একদিকে যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রীরাও পড়ছেন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে। বাস চালক এমদাদুল ইসলাম বলেন, শুধু বাস বা ট্রাকচালকদের কারনে দুর্ঘটনা হয় না । মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি অতিক্রম এবং পথচারীদের হঠাৎ রাস্তা পারাপারও দুর্ঘটনার কারণ। মোটরসাইকেল চালক মেহেদী হাসান বলেন, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর অনেক পরিবহন একে অপরকে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় নামে। তাদের বেপরোয়া গতির কারণে এঙ্প্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল চালানো এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে এখন মূল এঙ্প্রেসওয়ে এড়িয়ে নিচের বিকল্প বাইপাস সড়ক দিয়ে চলাচল করি। দুর্ঘটনা কমাতে বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই ভাঙ্গা হাইওয়েতে দুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তিদের শিবচর অথবা ঢাকায় নিতে হয়। এতে অনেক সময় লেগে যায়। আড়িয়াল খাঁ সেতুর পাশে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি চালু করা গেলে অনেক আহত ব্যক্তির প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত এটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন বলেন, এঙ্প্রেসওয়েতে আমাদের এআই প্রকল্প রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। প্রকল্পটি চালু হলে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্পিড গান ব্যবহারের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ নেই, সীমিত পর্যায়ে চলছে। যাতে মানুষের হয়রানি না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু পুলিশি নজরদারি নয়, চালক ও যাত্রীদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। সবার সম্মিলিত সচেতনতাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।