Home আলোচিত সংবাদ ৩৮২৫ কোটি টাকার ইভিএম ধ্বংস করা হবে

৩৮২৫ কোটি টাকার ইভিএম ধ্বংস করা হবে

4


ঢাকা অফিস
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বোঝা হিসেবে পরিচিত সেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনগুলো (ইভিএম) অবশেষে ধ্বংস করা হচ্ছে। বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গুদাম ভাড়া গুনতে হিমশিম খাওয়ার পর মেশিনগুলো ধ্বংসের এমন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। তবে আইনি জটিলতা আছে, এমন যন্ত্রগুলো রেখে দেওয়া হবে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, গত ১২ অক্টোবর ইসির ১৩তম কমিশন সভায় ইভিএম নিয়ে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় এ নিয়ে ইসি গঠিত কমিটির প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। পরে মামলা সংক্রান্ত বিষয় বা আইনি জটিলতা আছে, এমন নির্বাচনে ব্যবহৃত মেশিনগুলো রেখে বাকিগুলো ধ্বংস করার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে নানা আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বর্তমান কমিশন। গত ৬ এপ্রিল ইসির ১১তম কমিশন সভায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ইভিএমের ব্যবহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

২০১৮ সালে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকায় দেড় লাখ ইভিএম কিনেছিল ইসি। বর্তমানে তাদের কাছে এক লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। বাকি এক হাজার ৫৯৯টির কোনো খোঁজ মিলছে না। যেগুলো আছে সেগুলোও দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবহার বন্ধ থাকায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এগুলোর সংরক্ষণ বাবদ বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) ওয়্যারহাউসের বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকার বেশি দাঁড়িয়েছে। মাঠ পর্যায়ে দেশের ৪১টি জেলার বেসরকারি গুদাম ভাড়া বাবদ মাসে আরও গুনতে হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

এর আগে ওয়্যারহাউস ভাড়া বাবদ পাওনা ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধের তাগাদা দেওয়ার পাশাপাশি এগুলো আর নিজেদের জিম্মায় রাখার বিষয়ে অপারগতা জানিয়ে চিঠিও দিয়েছে বিএমটিএফ। তবে মেশিন সংরক্ষণ বাবদ বছরে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েও পরিকল্পনা কমিশনের সাড়া না মেলায় বিপাকে ইসিও।

অন্যদিকে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের প্রতীক এই ইভিএম প্রকল্পকে ঘিরে এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে। এর আগে নির্বাচন কমিশনের তিন কর্মকর্তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। প্রকল্পটিকে ঘিরে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের নিরীক্ষা (অডিট) আপত্তিও রয়েছে। ইভিএমের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসি গঠিত অভ্যন্তরীণ কমিটিও এ নিয়ে কাজ করে প্রতিবেদন দিয়েছে।

২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি ইভিএম প্রথম ব্যবহার করা হয়। পরে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইভিএমের সমস্যা দেখা দিলে পরে আর কোনো নির্বাচনে বুয়েটের তৈরি ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেড় লাখ ইভিএম কিনতে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এক বছরের ওয়ারেন্টি এবং পাঁচ বছরের সাপোর্ট সার্ভিসের কথা উল্লেখ থাকলেও এতগুলো যন্ত্র কোথায় রাখা হবে, তার উল্লেখ ছিল না। তারপরও তড়িঘড়ি করে বিএমটিএফ নির্মিত দেড় লাখ মেশিন কেনা হয়। তবে প্রকল্পটি নিয়ে তখনই আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিটি ইভিএম কেনা হয় দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকায়, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ। পরে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৬ জুন একটি পৌরসভার সাধারণ এবং চারটি পৌরসভার উপনির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।

এরই মধ্যে ২০২৪ সালের জুনে ইভিএম প্রকল্পের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে তা আরও এক বছর বাড়ানো হয়। সেই সময়ও শেষ হয়েছে গত বছরের জুনে। ইসিকে বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে বিদায় নিয়েছে প্রকল্পের সব জনবল।

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ওই বছরের নভেম্বরে এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন দায়িত্ব নেয়। পরে ইভিএমের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে ইসি কর্মকর্তা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগসহ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সুপারিশ করে। জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর যে প্রতিবেদন দেয়, সেখানেও ইভিএমকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। এটিকে একটি অদূরদর্শী ও অপচয়মূলক প্রকল্প এবং নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

বিলুপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম বলেন, তাদেরও সুপারিশ ছিল ইভিএমের মতো নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছুর ব্যবহার যেন আর কোনো নির্বাচনে না হয়। নির্বাচন কমিশন সবার মতামত বিবেচনায় নিয়েই আরপিওতে ইভিএমের অংশ বাদ রেখেছে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে এর ব্যবহার হবে না।
তিনি বলেন, ইভিএমগুলো ধ্বংসের ইসির সিদ্ধান্ত ভালো পদক্ষেপ। এখন দুদকেরও উচিত হবে অতি দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি এবং ইভিএমগুলো পরিদর্শন করে ও সব মেশিন ধ্বংসের নির্দেশনা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে এই জঞ্জাল থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, কমিশন চায় যত দ্রুত সম্ভব ইভিএমগুলোর নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে।