অনলাইন ডেস্ক।।
ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমাগত অত্যাচারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার চক্রান্ত দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আধুনিক বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদাসীনতার কঠোর সমালোচনা করেন। ইস্তাম্বুলে আয়োজিত ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড ফোরাম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
এরদোয়ান বলেন, ফিলিস্তিনিরা শত শত বছর ধরে নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটামাটিতে বসবাস করে আসছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তাদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস ক্রমেই মাত্রা ছাড়াচ্ছে। পশ্চিম তীরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা এমন সংঘাতের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, শুধু গত অক্টোবর মাসেই দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে ৩ হাজারের বেশি হামলা ও লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
গত ৯ আগস্ট থেকে কোসরা অঞ্চলে ইসরায়েলি দখলদাররা ফিলিস্তিনিদের তিনটি বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এলাকাটিকে ‘রুদ্ধদ্বার সামরিক অঞ্চল’ দাবি করে পরিবারগুলোকে ভেতরে প্রবেশ বা বের হতে দিচ্ছে না। উল্লেখ্য, পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন এবং সেখানে প্রায় ৫ লাখ অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী রয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের অধিকাংশ দেশই সামরিক দখলের অধীনে তৈরি এই বসতিগুলোকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করে।
বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এরদোয়ান বলেন, ৮১ বছর আগে যারা ক্ষমতা ও বিশেষ সুবিধায় ছিলেন, তাদের তৈরি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আজকের বিশ্বজনীন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়েছে। যুদ্ধ, সংঘাত, অস্থিরতা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ভুক্তভোগী হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু তুরস্ক নয়, পুরো বিশ্ব এখন এই বাস্তবতা পরিষ্কার দেখতে ও বুঝতে পারছে যে গতকালের সমাধান দিয়ে আজকের সমস্যার সমধান সম্ভব নয়। আমাদের নিজস্ব অঞ্চলসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই ব্যবস্থা এখন আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা তুলে ধরেছে।
গাজায় ভয়াবহ মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান অভিযোগ করেন, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। রুয়ান্ডা, স্রেব্রেনিৎসা এবং রক্তপাতে ভেজা অন্যান্য স্থানে সংস্থাগুলো যেভাবে কেবল নীরব দর্শক ছিল, গাজার ঘটনার ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে তারা মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৫৮৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫,৭১১ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের এই জেনোসাইড বা গণহত্যামূলক যুদ্ধে ৭৪,৫০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু, এবং আহত হয়েছেন ১,৭৫,০০০ জনেরও বেশি।
তুরস্কের মধ্যস্থতায় হওয়া গাজা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তীব্র সমালোচনা করেন এরদোয়ান। প্রতিশ্রুতি না রাখার সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বড় বাধা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তুরস্ক যার অংশ ছিল, সেই গাজা শান্তি চুক্তি দুর্ভাগ্যবশত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি প্রতিশ্রুতি পালনের নীতিটি এখানে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হচ্ছে। সবার বোঝা উচিত, এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে না পারার চরম ব্যর্থতা বোঝাতে গিয়ে তিনি একটি বিখ্যাত ইরানি প্রবাদের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, এই সংস্থাগুলো মানবিক ট্র্যাজেডিগুলো উদ্বেগ নিয়ে দেখা কিংবা নিজেরদের চিন্তা প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপই নেয় না। সেই বিখ্যাত ইরানি প্রবাদের মতোই এদের অবস্থা, ‘তারা একত্রিত হয়, আলোচনা করে এবং ভেঙে যায়।’











































