শ্যামনগর প্রতিনিধি
একসময় ছিল জমিদারি আভিজাত্য, বিশাল প্রাসাদ, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য আর নানা কারুকাজের সমাহার। অতিথি-অভ্যাগতদের পদচারণ, নহবতখানায় বাদ্যযন্ত্রের সুর আর জমজমাট পরিবেশে মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্যের অধিকাংশই আজ হারিয়ে গেছে। অযত্ন, অবহেলা ও দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঐতিহাসিক নকিপুর জমিদারবাড়ি। একসময়ের তিনতলা বিশাল প্রাসাদের দেয়াল ও ছাদের বড় অংশ ধসে পড়েছে। চারপাশে জন্মেছে আগাছা, ঘাস ও গাছপালা। হারিয়ে যেতে বসেছে জেলার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন।
শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে নকিপুর এলাকায় অবস্থিত এ জমিদারবাড়ি। প্রায় ২ দশমিক ৯২ একর জমির ওপর নির্মিত প্রাসাদটির দৈর্ঘ্য ছিল ২১২ ফুট। একসময় ভবনটিতে ছিল ৩৯টি কক্ষ। সারিবদ্ধ স্তম্ভ, দৃষ্টিনন্দন খিলান, কারুকাজ করা দেয়াল এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে পশ্চিম অংশের কয়েকটি স্তম্ভ ও খিলান কোনো রকমে টিকে থাকলেও পূর্ব পাশের দীর্ঘ ভবনের অধিকাংশই ধসে গেছে। প্রাসাদের চারপাশ কলাগাছ, ঘাস ও আগাছায় ঢেকে থাকায় অনেক স্থাপনার অস্তিত্বও সহজে চোখে পড়ে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই বিলীন হচ্ছে এর অস্তিত্ব। জমিদারবাড়ির পাশের বাসিন্দা নয়ন হোসেন জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ভবনটির এমন জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে আসছেন। অন্তত এক দশক আগে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থাপনাটির অনেকাংশ রক্ষা করা সম্ভব হতো। যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি সাতক্ষীরার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারত।

জানা গেছে, বর্তমানে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির ভেতরে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন আনোয়ারা বেগম (৫৬) ও ফাতেমা বেগম (৬২) নামের দুই নারী। তাঁদের অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই দিন কাটছে।
জমিদারবাড়ির সামনের মাঠের দক্ষিণ পাশে রয়েছে পাশাপাশি দুটি শিবমন্দির। চারচালা ঘরের আদলে নির্মিত মন্দির দুটি এখনো তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে পুকুরের ঘাটসংলগ্ন অষ্টকোনা আকৃতির দোতলা নহবতখানার অধিকাংশই ধসে পড়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে দেয়ালের কিছু অংশ ও ভিত্তি। একসময় জমিদারবাড়ির আভিজাত্যের অন্যতম প্রতীক ছিল এই নহবতখানা।
যেভাবে গড়ে উঠেছিল জমিদারবাড়ি:
ইতিহাস ও স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরী ১৮৮৮ সালে নকিপুর জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন। তিনি ১৮৬৬ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কিছু ধারণায় বাড়িটিকে ২০০ থেকে ৩০০ বছরের পুরোনো বলা হলেও গবেষকদের মতে, স্থাপনাটি ঊনবিংশ শতকের শেষ ভাগের। এর নির্মাণশৈলীতে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।
হরিচরণ রায় শুধু জমিদারি পরিচালনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, এলাকার জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর অবদান ছিল। তাঁর উদ্যোগে পুকুর খনন, সড়ক ও খাল নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মতো নানা কাজ সম্পন্ন হয়। ১৮৯৯ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নকিপুর মাইনর স্কুল বর্তমানে নকিপুর হরিচরণ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর হরিচরণ রায়ের উত্তরাধিকারীরা আর্থিক সংকটে পড়েন। ১৯৭১ সালে পরিবারের সর্বশেষ উত্তরাধিকারীরা কলকাতায় চলে গেলে জমিদারবাড়িটি কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এরপর দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির অবকাঠামো দুর্বল হতে থাকে। একসময়কার মূল্যবান আসবাব ও বিভিন্ন সামগ্রীও চুরি ও লুটপাটের শিকার হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
নকিপুর জমিদারবাড়ির ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফেলো সাথী খাতুন। তাঁদের যৌথ গবেষণার শিরোনাম ‘মনুমেন্টস অ্যান্ড মেমোরি: দ্য আর্কিটেকচারাল ওয়ার্কস অব জমিদার হরিচরণ রায়’। চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক ব্রুকলিন রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিশিং ইনস্টিটিউটের জার্নাল অব অ্যানথ্রোপলজি অ্যান্ড আর্কিওলজি সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় জমিদারবাড়ির নির্মাণশৈলী, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জোড়া স্তম্ভ, খিলান, শিবমন্দির এবং অষ্টকোনা আকৃতির নহবতখানা এ স্থাপনাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। গবেষকদের মতে, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবেই নয়, বরং সাতক্ষীরার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিতি পেতে পারে।
গবেষক মো. শহিদুল ইসলাম মনে করেন, নকিপুর জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। তা না হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংরক্ষণের উদ্যোগের আশ্বাস:
এ বিষয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানিয়েছেন, জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের মধ্যে নকিপুর জমিদারবাড়ি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের আশ্বাস যেন শুধু চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে জরিপ, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হোক। একই সঙ্গে জমিদারবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করে পর্যটকদের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা হোক। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে ধ্বংসের মুখে থাকা নকিপুর জমিদারবাড়ি আবারও সাতক্ষীরার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।











































