ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
জলাশয়ের পানি পরিশোধন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে শামুক। সেই শামুকই এখন পরিণত হয়েছে মাছের ঘেরের অন্যতম খাদ্যে। গলদা চিংড়ি ও পাঙাশ মাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং অধিক লাভের আশায় ডুমুরিয়া উপজেলার খাল-বিল ও মুক্ত জলাশয় থেকে অবাধে সংগ্রহ করা হচ্ছে শামুক। চলছে জমজমাট কেনাবেচা ও খোলস ছাড়ানোর কাজ।
এতে একদিকে কমছে জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণী, অন্যদিকে খোলস ছাড়ানোর বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও।
মাছের খাদ্য ঘিরে শামুকের বাণিজ্য:
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়া সদর, হাসানপুর, রুদাঘরা, রংপুর, শলুয়া, গুটুদিয়া, ভান্ডারপাড়া, শরাফপুর, শোভনা, খর্নিয়া, বান্দা, তালতলা, সাহস, ধামালিয়া, বটবেড়া, শাহাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিঠাপানিতে গলদা চিংড়ি ও পাঙাশ মাছের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি এবং ছোট-বড় মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাধিক ঘেরে পাঙাশ মাছের চাষ হচ্ছে। এসব মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে শামুক। এসব ঘেরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বাজারে গড়ে উঠেছে শামুক বিক্রির কেন্দ্র।
উপজেলার রংপুর ও লতাখামারবাটি গ্রামের মাছচাষি মো. আমিনুর রহমান গাজী ও বিমলকৃষ্ণ বিশ্বাস জানান, গলদা চিংড়ি ও পাঙাশ মাছকে শামুকের মাংস খোলস ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরা করে খাওয়ানো হয়। এতে মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং তাড়াতাড়ি বিক্রির উপযোগী হয়। ফলে শামুকের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে।
এক শ্রেণির অভাবী মানুষ স্থানীয় খাল, বিল ও মুক্ত জলাশয় থেকে শামুক সংগ্রহ করে ঘেরমালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতি ১০০টি শামুক বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। খোলস ছাড়ানো শামুকের মাংস প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বস্তা বা ঝুড়ি হিসেবেও বিক্রি হচ্ছে শামুক।
গুটুদিয়া ইউনিয়নের বিলপাবলা গ্রামের অমল কুমার রায় ও অনিতা বিশ্বাস জানান, প্রতিদিন বিল ও খাল থেকে শামুক কুড়িয়ে ঘেরমালিকদের কাছে বিক্রি করেন। এতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়।
স্থানীয়ভাবে শামুক সংগ্রহের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও আসছে শামুক। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে বস্তাবন্দি শামুক আনা হচ্ছে ডুমুরিয়ায়। স্থানীয় দরিদ্র মানুষ চুক্তিতে সেগুলোর খোলস ছাড়ানোর কাজে যুক্ত হন।
খোলস ছাড়ানোর কাজে শিশু:
উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে এবং ঝুপড়িঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে শামুক ভাঙার কাজ। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও এ কাজে অংশ নিচ্ছে। রুদাঘরা ইউনিয়নের হাসানপুর গ্রামের হাসিনা বেগম ও জোবায়দা বেগম জানান, তারা প্রতিদিন একজন প্রায় তিন বস্তা শামুক ভাঙতে পারেন। এতে ৪০০ টাকা আয় হয়। শিশুদেরও এ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। শিশু মিনতি রায় (৬) ও কল্পনা মণ্ডল (৭) জানায়, তারা মা-বাবার সঙ্গে বিনা পয়সায় শামুক ভাঙছে। মূলত বাড়তি আয়ের আশায় তারা মা-বাবাকে এই কাজে সাহায্য করছে।
বেসরকারি সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর পরিবেশকর্মী শেখ সেলিম আক্তার স্বপন বলেন, শামুক ভাঙার কাজে শিশুদের নিয়োজিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি এর স্বাস্থ্যঝুঁকিও প্রকট। এ ছাড়া যত্রতত্র শামুকের খোলস ফেলে রাখায় মানুষ বা প্রাণিকুলের শরীরে তা বিঁধে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ সুফিয়ান রুস্তম বলেন, শামুক ভাঙার কাজে নিয়োজিত শিশুরা চর্মরোগ, পেটের পীড়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া ধারালো খোলস শরীরে ফুটে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি করে গুরুতর রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকৃতির প্রাকৃতিক ছাঁকনি শামুক:
শামুক জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। বিভিন্ন প্রজাতির শামুক জলজ খাদ্যশৃঙ্খল, পুষ্টিচক্র ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিছু প্রজাতি পানির ভেতরের জৈব পদার্থ ও শৈবাল খেয়ে জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অবদান রাখে। তাই নির্বিচারে শামুক আহরণ জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সোয়েল জিল্লুর রহমান রিগান জানান, শামুক পানির প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। এটি নিধনের ফলে জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়। চিংড়ি ও পাঙাশ মাছের খাদ্য হিসেবে শামুকের মাংস ব্যবহার না করার জন্য মাছচাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া মাছের খাদ্য হিসেবে শামুকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এর পরিবর্তে বিভিন্ন কোম্পানির মাছের ফিড, সিদ্ধ চাল, গম কিংবা খুদ-কুড়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, শিশুদের দিয়ে শামুক ভাঙার কাজ করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি স্পষ্টতই শিশুশ্রমের আওতাধীন। দেশের প্রচলিত আইনে শিশুদের দিয়ে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।











































