Home আঞ্চলিক সবুজ পল্লী কলেজ: শিক্ষক নেই, নিয়মিত পাঠদানও নেই: এইচএসসিতে সবাই ফেল

সবুজ পল্লী কলেজ: শিক্ষক নেই, নিয়মিত পাঠদানও নেই: এইচএসসিতে সবাই ফেল

10


যশোর অফিস
ধানখেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভবন। একটির পলেস্তরা খসে পড়েছে। ভবন দুটি দেখে মনে হতে পারে, এটি বন্যাকবলিত কোনো দুর্গম এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এটি যশোরের মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া ইউনিয়নের ‘সবুজ পল্লী কলেজ’।
প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর পর এবার কলেজটিতে এইচএসসি পরীক্ষায় ঘটেছে চরম ফল বিপর্যয়। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাতজন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি। নন-এমপিওভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়া এবং নানা প্রতিবন্ধকতায় শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষক নেই, নিয়মিত পাঠদান নেইÑতাহলে শিক্ষার্থীরা পাস করবেন কীভাবে? এমন প্রশ্ন এখন খেদাপাড়া এলাকার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খেদাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম ওমর ফারুকের উদ্যোগে ২০০৩ সালে সবুজ পল্লী কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাঠদানের অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। ১৫ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল কলেজটির।
তবে প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর থেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে কলেজটি। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করেও কোনো বেতন পাননি বলে জানিয়েছেন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম হোসেন। তিনি বলেন, ‘২৩ বছর ধরে কলেজে শিক্ষকতা করছি, কিন্তু এক পয়সাও বেতন পাইনি। আমার ছেলেমেয়ে আছে, সংসার আছে। এভাবে কত দিন চলা সম্ভব?’
কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা বিএনপি নেতা হওয়ায় রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হতে বারবার বাধার মুখে পড়েছে। তাদের ভাষ্য, মণিরামপুরের সাবেক সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতানের সময় তেমন বাধা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্বপন ভট্টাচার্য সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষকরা বেতন-ভাতা না পেয়ে একে একে কলেজ ছেড়ে চলে যান। এতে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমতে থাকে।
অন্যদিকে, কলেজটির পাশেই খেদাপাড়ায় ‘মাতৃভাষা কলেজ’ নামে আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত এমপিওভুক্ত হলেও বয়সে পুরোনো সবুজ পল্লী কলেজটি এমপিওভুক্তির সুযোগ পায়নি বলে অভিযোগ কর্তৃপক্ষের। পরে ২০২৫ সালে সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলী কলেজটিতে একটি নতুন ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেন।

দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তি না হওয়ায় কলেজটিতে শিক্ষক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মানবিক বিভাগের পাঁচজন প্রভাষক দিয়ে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ইংরেজি বিভাগের একমাত্র প্রভাষক এস আলম ২০২৫ সালের ৪ মার্চ মারা যান। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগে আগ্রহী কাউকে পাওয়া যায়নি।
ফলে ইংরেজি শিক্ষক ছাড়াই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল ইসলাম জানান, একজন খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বেতন দিতে না পারায় তিনি দুই মাসের মাথায় আর আসেননি। পরে ভূগোল বা অর্থনীতির শিক্ষকদের দিয়েই কোনো রকমে পাঠদান চালাতে হয়েছে।
ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি: গত কয়েক বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে কলেজটির শিক্ষার মানের অবনতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে ৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন ২৯ জন। ২০২৩ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করেন ২৬ জন। ২০২৪ সালে ১০ জনের মধ্যে পাস করেন আটজন। ২০২৫ সালে পাঁচজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন তিনজন।

সর্বশেষ চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় সাতজন অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেননি। তাদের মধ্যে তিনজন এক বিষয়ে এবং দুজন দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।

কলেজ মোড়ের দোকানি আবু রহিম বলেন, ‘একসময় এলাকার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে এই কলেজে পড়ত। কিন্তু শিক্ষকরা একে একে চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও কলেজে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।’

ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী জানান, শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শিক্ষা বোর্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

কলেজের সভাপতি কবীর হোসেন বলেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম পাসের হার শূন্যে নেমেছে। ইংরেজি শিক্ষক থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আগামীতে যাতে এ ধরনের ফল বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।