খুলনাঞ্চল রিপোর্ট।।
হাতে আধুনিক স্মার্টফোন। আঙুলের এক স্পর্শেই চোখধাঁধানো ভার্চুয়াল জগৎ। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, শিশুটি ঘরের এক কোণে শান্ত হয়ে বসে ভিডিও দেখছে কিংবা গেম খেলছে। কিন্তু পর্দার ওপারে যে কত ভয়াবহতা ও প্রাণঘাতী ফাঁদ অপেক্ষা করছে, তা বুঝে ওঠার আগেই ঝরে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহার, টিকটক-ফেসবুকের আকর্ষণ এবং অনলাইন যোগাযোগ এখন শিশুদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠেছে। এতে শুধু শিশুদের মানসিক বিকাশই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, অনলাইন যোগাযোগের সূত্র ধরে ঘটছে অপহরণ, ব্ল্যাকমেইল, যৌন হয়রানি, এমনকি নৃশংস হত্যাকাণ্ডও। এসব ঘটনা এখন প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন শিশুদের সামনে এমন এক অচেনা জগৎ খুলে দিয়েছে, যেখানে কে বন্ধু আর কে অপরাধীÑতা বুঝে ওঠার মতো মানসিক পরিপক্বতা তাদের থাকে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ও অপরাধী চক্র শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকির মুখে। সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে অপ্রতিমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার তদন্তে পুলিশ ভুক্তভোগীর অনলাইন যোগাযোগ, একটি আইফোন এবং টিকটক ভিডিও তৈরির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, শিশুদের অনলাইন জগৎ তাদের বাস্তব জীবনের নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শুধু কুমিল্লার এই ঘটনা নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ফেনীতে ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে হয়রানির ঘটনা ভিডিও করে টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে দেখা করতে গিয়ে ঢাকার এক কিশোরী কুমিল্লায় ধর্ষণের শিকার হয়।
সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের সুযোগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কুমিল্লার অপ্রতিম: টিকটক ভিডিওর প্রলোভনে প্রাণ গেল শিশুর: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, সে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা বা টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলেছিল। পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, অপ্রতিম বয়সে বড় কয়েকজনের সঙ্গে টিকটক ভিডিও তৈরি করত। এ ঘটনায় প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)সহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরিবারের সদস্যরা বলেন, “ছেলেটা শুধু ভিডিও বানাতে গিয়েছিল। এখন আমাদের পুরো জীবন শূন্য।” এ ঘটনা শিশুদের অপরিচিত কিংবা বয়সে বড় ব্যক্তিদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরেছে।
ফেনীর ছয় বছরের শিশু: টিকটক ভিডিও ছড়িয়ে হয়রানি: জুলাইয়ের শেষ দিকে ফেনী সদর উপজেলার গোবিন্দপুরে ছয় বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রী স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হয়রানির শিকার হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিন যুবক তাকে আটকে হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং ঘটনাটি ভিডিও করে টিকটকে আপলোড করে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশুটির বাবা মামলা করেন। পুলিশ ২০ বছর বয়সী মোজাম্মেল হোসেন প্রকাশকে গ্রেপ্তার করে। শিশুটি এখনো ভয়ে ঘুমাতে পারে না। তার বাবা বলেন, “বাচ্চা ঘুমের মধ্যেও বলে ওঠে, মুখ সেলাই করে দিও না। টিকটকের জন্য একটা শিশুর জীবন নষ্ট হয়ে গেল।”
অনলাইন পরিচয়ের সূত্রে কুমিল্লায় ধর্ষণের শিকার কিশোরী: ঢাকার এক কিশোরীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক যুবকের পরিচয় হয়। কয়েক মাস চ্যাট করার পর ওই যুবকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে কুমিল্লায় ধর্ষণের শিকার হয় কিশোরীটি। পরিবারের সদস্যরা জানান, মেয়েটি প্রথমে ভেবেছিল, যুবকটি তার সমবয়সী। কিন্তু বাস্তবে সে বয়সে অনেক বড় ছিল এবং পরিকল্পিতভাবে কিশোরীকে ফাঁদে ফেলে। এ ধরনের ঘটনা অনলাইন পরিচয়ের সূত্র ধরে কিশোরীদের বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তা তুলে ধরছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে দেশে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, বিএমজে ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৮৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম স্মার্টফোন।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণের দিকে ঝুঁকছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা নিষিদ্ধ করার আইন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সালের মার্চে এবং মালয়েশিয়া জুনে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের সংশোধিত টেলিযোগাযোগ আইনে প্রযুক্তিগত অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ও বয়সভিত্তিক যাচাইয়ের প্রাথমিক বিধান রাখা হলেও অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিদ্যমান আইনি কাঠামো শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা দিতে কতটা সক্ষম, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই তুলে ধরছেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বুলবুল আহমেদ খান জানান, “কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করে, তা বিকাশমান অবস্থায় থাকে। ফলে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন বা ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তারা অনুধাবন করতে পারে না।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের গবেষণাতেও দেখা গেছে, শিশুদের মধ্যে সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার দিন দিন বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম রেজাউল ইসলাম মনে করেন, “শুধু আইন করে বা বয়সসীমা নির্ধারণ করে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকলে শিশুরা অনেকটাই নিরাপদ থাকবে। বয়স যাচাইয়ের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর দিক নিয়ে তরুণ ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইউ-রিপোর্টের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ শিশু ও তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া খবর ও নেতিবাচক বিষয়বস্তুকে তাদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ মনে করে। অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে মত দিয়েছেন। অভিভাবকেরা জানান, পড়াশোনা ও যোগাযোগের প্রয়োজনে সন্তানদের হাতে স্মার্টফোন দিতে হলেও তারা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাঁদের মতে, শুধু ফোন কেড়ে নেওয়া সমাধান নয়। পারিবারিক খোলামেলা যোগাযোগের পাশাপাশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকাও জরুরি।
আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী সদস্য ইমতিয়াজ বিন হাফিজও মনে করেন, “যেহেতু এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের সম্পৃক্ততা থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হয়, তাই নিরাপত্তার মূল দায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিতে হবে।”
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোও নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর ও অশ্লীল বিষয়বস্তু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সরকার কাজ করছে। ডিজিটাল ঝুঁকি থেকে তরুণদের রক্ষা করতে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। একইভাবে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগও বয়স উপযোগী অনলাইন সুরক্ষা ও অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট শিশুদের শেখা ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং কঠোর বয়সসীমা নির্ধারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই গড়ে তোলা সম্ভব নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ। অপ্রতিমের মতো ঘটনা যেন কেবল একটি সংবাদ হয়েই না থাকে; বরং শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার উপলক্ষ হয়ে ওঠে।











































