Home Lead অটোরিকশার ব্যাটারিতে সিসার বিষ, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

অটোরিকশার ব্যাটারিতে সিসার বিষ, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ

2


খুলনাঞ্চল রিপোর্ট
সবুজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে একসময় দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। নগর থেকে গ্রামÑসবখানেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই যান। কিন্তু সস্তা ও সহজ যাতায়াতের আড়ালে তৈরি হয়েছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি। এর অন্যতম কারণ অটোরিকশায় ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ পুনর্ব্যবহার। অকেজো ব্যাটারি ভাঙা, সিসা সংগ্রহ এবং খোলা জায়গায় তা গলানোর ফলে মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত সিসা। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীরে, বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে।


সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও পরিবেশবাদীদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। বর্তমানে সারাদেশে আনুমানিক ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একটি অটোরিকশা সচল রাখতে সাধারণত চারটি সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি প্রয়োজন হয়। এসব ব্যাটারির গড় আয়ু প্রায় এক বছর। সেই হিসাবে বছরে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ব্যাটারি ব্যবহারের মেয়াদ হারিয়ে অকেজো হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১২ ভোল্টের প্রতিটি ব্যাটারিতে প্রায় ৮ থেকে ১২ কেজি সিসা থাকে। ফলে বাতিল ব্যাটারির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সিসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। অথচ এসব বর্জ্যরে বড় অংশ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে।


প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও নগর বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে অটোরিকশার বিস্তার এবং ব্যাটারি বর্জ্যরে অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নগরায়ণ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় যে নীতিহীন অনিয়ম তৈরি হয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার তারই এক বড় প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় পর্যায়ে কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সারাদেশে ঠিক কত হাজার বা লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ বা সঠিক পরিসংখ্যান নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই উদাসীনতার কারণেই অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো বিপজ্জনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। শহরের আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমির আশপাশে ব্যাটারির ভাঙারি গড়ে ওঠা নগরের বসবাসের উপযুক্ততাকে সরাসরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। অবিলম্বে অটোরিকশা নিবন্ধন ও ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একক সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে না আনলে এই পরিবেশগত বিপর্যয় আমাদের শহরগুলোকে পুরোপুরি বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।”


নগরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন লাখো অটোরিকশা চলাচল করছে। যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন, চালকেরা জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু এই সহজ যাত্রার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি ভাঙা ও খোলা জায়গায় সিসা গলানোর ফলে বিষাক্ত ধাতুটি মাটি, পানি ও বাতাসে মিশছে। পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।
পরিবেশবিদ ড. আনিসুর রহমান বলেন, “সিসা একবার পরিবেশে মিশলে তা সহজে নষ্ট হয় না। মাটির সঙ্গে মিশে ফসলে প্রবেশ করে, পানির সঙ্গে মিশে খাবারের চেইনে চলে আসে। আমরা যে সবজি বা ফল খাই, তার অনেকটিতেই এখন সীমিত মাত্রায় সিসা পাওয়া যাচ্ছে। এটি শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন।”
আরেক পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “অবৈধ রিসাইকেল ইউনিটগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের বেশিরভাগই কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেন না। তাদের রক্তে সিসার মাত্রা অনেক বেশি। তারা নিজেরাও জানেন না কতটা বিপদের মধ্যে আছেন।”
সিসার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকদের বক্তব্যও উদ্বেগজনক। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র চিকিৎসক ডা. মাহবুবুল হক বলেন, “সিসা একটি শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। রক্তে সিসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার হলেই শিশুর বুদ্ধিমত্তা কমে যেতে পারে। এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। যুক্তি, স্মৃতি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাÑসবকিছুই প্রভাবিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষা, কর্মদক্ষতা এবং আয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব অপরিসীম।”
তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী মায়ের শরীরে সিসা প্রবেশ করলে তা গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এতে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হয়।


ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রোকসানা বেগম জানান, তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলের রক্তে সিসার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। স্থানীয় একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা করানোর পর চিকিৎসক জানিয়েছেন, আশপাশের ব্যাটারি ভাঙার কারখানা থেকে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও ধুলার কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তাঁর ছেলে এখন স্কুলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। কথা বলতেও দেরি হচ্ছে।


নারায়ণগঞ্জের একটি গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক বলেন, গত কয়েক বছর ধরে তাঁর জমিতে ফসলের ফলন কমে গেছে। মাটি পরীক্ষা করে সিসার মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। তাঁর অভিযোগ, পাশের এলাকায় কয়েকটি অবৈধ ব্যাটারি গলানোর কারখানা চালু হওয়ার পর থেকেই এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।


সিসা দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যাপক। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, সিসা দূষণের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি হারাচ্ছে। এর মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের প্রভাবও রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা জানি সমস্যা কোথায়। কিন্তু অবৈধ ইউনিটগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে জড়িত। অভিযান চালালেও কয়েকদিন পর আবার চালু হয়ে যায়। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং অবৈধগুলোকে কঠোরভাবে বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই।”


এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির তুলনায় এসব ব্যাটারি দীর্ঘস্থায়ী এবং সিসাজনিত দূষণের ঝুঁকি নেই। একটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি সেটের দাম ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা। অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেটের দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা। এর আয়ুষ্কাল চার থেকে আট বছর পর্যন্ত হতে পারে।


তবে বেশি দামই এই বিকল্প ব্যবহারের প্রধান বাধা। একটি সাধারণ অটোরিকশার দাম যেখানে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, সেখানে দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার ব্যাটারি যুক্ত হলে যানটির মোট খরচ দাঁড়ায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার বেশি। ফলে স্বল্প আয়ের চালকদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন। এর পাশাপাশি দেশে মোট কত অটোরিকশা চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় পরিকল্পিতভাবে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।


সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন, সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা ও তফসিল সংশোধন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যানবাহনের নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্সের ব্যবস্থা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। ব্যাটারি উৎপাদন, বিক্রি, সংগ্রহ, পরিবহন, ব্যবহার এবং মেয়াদ শেষে পুনর্ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ ব্যাটারি গলানোর কারখানা বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পরিবেশবিদ ড. সালমা আক্তার বলেন, “এটি শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং অর্থনীতির সমন্বিত সংকট। আমরা যদি এখন ব্যবস্থা না নিই, তাহলে আগামী প্রজন্মকে বিষাক্ত পরিবেশে বড় হতে হবে। শিশুদের আইকিউ কমে যাওয়া মানে জাতির ভবিষ্যৎ ক্ষমতা কমে যাওয়া।”
তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে সক্রিয় হতে হবে। ব্যাটারি বিক্রেতা ও মেরামতকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে পুরোনো ব্যাটারি সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অনেক এলাকায় রাতের বেলায় ব্যাটারি ভাঙা ও সিসা গলানোর কাজ করা হয়। এতে প্রশাসনের নজর এড়ানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লেও স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। কিছু এলাকায় স্কুল ও খেলার মাঠের কাছাকাছিও এ ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে। ফলে শিশুরা খেলাধুলার সময়ও বিষাক্ত ধুলার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে কিডনি ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি, উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সব অটোরিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, ব্যাটারির উৎস ও নিষ্পত্তির তথ্য সংরক্ষণ, অবৈধ রিসাইকেল কারখানার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারে ভর্তুকি বা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পুরোনো ব্যাটারি যেন অননুমোদিত ব্যবসায়ীদের হাতে না যায়, সে জন্য সংগ্রহ ও ফেরত দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশবিদদের মতে, শুধু রিকশা নিবন্ধন বা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরালেই এই সংকটের অবসান হবে না। সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির উৎপাদন থেকে শুরু করে মেয়াদ শেষে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারÑপ্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সারাদেশে থাকা এক হাজার ১০০টিরও বেশি অবৈধ সিসা গলানোর কারখানা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত কারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা লাখো মানুষের জীবিকা ও যাতায়াতের সঙ্গে জড়িত। তাই এই যান বন্ধ করাই সমস্যার সমাধান নয়। প্রয়োজন নিরাপদ ব্যাটারি, নিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থা এবং পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুবিধার আড়ালে সিসার বিষ ছড়িয়ে পড়বে মানুষের শরীরে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।