শরণখোলা প্রতিনিধি।।
মৌসুমের শুরুতই দুর্যোগের কবলে পড়েছেন দেশের বৃহত্তম শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চরের জেলেরা। বৈরী আবহাওয়ায় প্রথম দিনেই প্রবল ঝোড়ো বাতাসের কারণে সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরতে নেমেও ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন তারা। মাছ ধরা বন্ধ রেখে শত শত নৌকা-ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও শুঁটকি পল্লির আশপাশের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
অন্যদিকে বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে জেলেদের ঘর নির্মাণ, মাছ শুকানোর চাতাল ও মাচা তৈরির কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন জেলে ও বহদ্দাররা।
আজ শুক্রবার ভোররাতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলঘেঁষা পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের শুঁটকি পল্লিতে এসে জড়ো হন হাজার হাজার জেলে ও বহদ্দার।
আলোরকোল, মাঝেরকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শ্যালার চরসহ নির্ধারিত চারটি চরে পৌঁছেই একদল জেলে মাছ ধরতে নামেন সাগরে। কিন্তু সাগরের উত্তাল ঢেউ এবং প্রবল বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে না পেরে ফিরে আসতে হয় তাদের। বৈরী আবহাওয়ার কারণে বন্ধ রয়েছে মাছ ধরা।
এদিকে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুমে মাছ আহরণের পাশাপাশি দ্রুত ঘর, ডিপো এবং শুকানোর চাতাল ও মাচা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাগর থেকে আহরণ করা মাছ যথাসময়ে শুকাতে না পারলে তা পচে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বৈরী আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে চরের আগাছা পরিষ্কার, জেলেদের থাকার ঘর, শুঁটকি সংরক্ষণের ডিপো নির্মাণ, শুকানোর মাচা, চাতাল তৈরি এবং বেড়া দেওয়ার কাজও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে মাছ আহরণ বন্ধ, অন্যদিকে মাছ শুকানোর অবকাঠামো প্রস্তুত করতে না পারায়, শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে শুঁটকি উৎপাদন।
আলোরকোল শুঁটকি পল্লির বহদ্দার ও রামপাল জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির শেখ বলেন, সাগরে প্রচণ্ড বাতাস এবং ঢেউ হচ্ছে। সকালে জেলেরা মাছ ধরতে নেমেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ থাকায় তাদের ফিরে আসতে হয়েছে। এখন সব নৌকা-ট্রলার নিরাপদে অবস্থান করছে। বৃষ্টির মধ্যেই ঘর তৈরির কাজ চলছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে আবহাওয়া ভালো না হলে মৌসুমের শুরুতেই বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হবে।’
আলোরকোলের আরেক বহদ্দার ও চাকলা জেলে সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রউফ মেম্বর বলেন, আবহাওয়া খারাপ থাকায় কোনো কাজই ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। চরের আগাছা পরিষ্কার করে মাচা-চাতাল ও বেড়া নির্মাণ করতে না পারলে মাছ ধরেও কোনো লাভ নেই। মাছ ধরলেও শুকানোর ব্যবস্থা না থাকলে তা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। এ কারণে আপাতত মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুবলা জেলেপল্লি বিশেষ টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে মোবাইল ফোনে বলেন, মৌসুমের শুরুতেই জেলেরা দুর্যোগের কারণে সংকটে পড়েছেন জেলে-বহদ্দাররা। সকালে কিছু জেলে মাছ ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন। কিন্তু উত্তাল ঢেউয়ের কারণে তারা নৌকা-ট্রলার নিয়ে বেশি সময় সাগরে থাকতে পারেননি। পরে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে সব নৌকা-ট্রলার চরের কাছাকাছি এবং সুন্দরবনের ছোট ছোট খালে নিরাপদে অবস্থান করছে।
তিনি আরও বলেন, চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী মৌসুমের প্রথম দিন চরে পৌঁছে একদল জেলে মাছ ধরতে সাগরে যান। অন্য দল জেলেপল্লিতে ঘর নির্মাণ, মাছ শুকানোর চাতাল ও মাচা তৈরি এবং বেড়া দেওয়ার কাজ করেন। কিন্তু এবার শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চরে অবস্থানরত জেলে ও মহাজনদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংকটকালে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম বলেছেনে, দুবলার চরের শুঁটকি উৎপাদন, মহাজনদের লাভ-লোকসান এবং রাজস্ব আয় সবকিছুই নির্ভর করে আবহাওয়া ভালো বা খারাপের ওপর। এবছর শুরুতেই আবহাওয়ার বৈরিতায় মাছ ধরা এবং শুঁটকি প্রক্রিয়ার কার্যক্রম বন্ধ। এতে ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
এ বছর শুঁটকি মৌসুমে নির্ধারিত চারটি চরে ১০১৮টি জেলেঘর, ৬৭টি ডিপোঘর এবং ১১৬টি দোকানঘর নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব ঘর নির্মাণে দেরি হলে প্রত্যাশিত শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে বন বিভাগ ও মহাজন উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই, যোগ করেন তিনি।











































