সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।
সাতক্ষীরার কলারোয়ায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পাঁচ শ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘কোটা বাড়ি’। সময়ের বিবর্তনে প্রাচীন স্থাপনাটির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। এখন টিকে আছে ভগ্নপ্রায় ইটের দেয়াল আর বিশাল এক বটগাছ। অথচ এই পুরোনো স্থাপনাকে ঘিরেই শত শত বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা লোককথা, বিশ্বাস ও অলৌকিক ঘটনার কাহিনি। রোগমুক্তি, বিপদ থেকে পরিত্রাণ এবং মনের আশা পূরণের প্রত্যাশায় প্রতি শুক্রবার এখানে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ। বসে ঐতিহ্যবাহী মানত মেলা।
স্থানীয় মানুষের কাছে কোটা বাড়ি শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়, বরং বিশ্বাস, আবেগ, আশা-ভরসা ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত নানা কাহিনি স্থানটিকে দিয়েছে বিশেষ পরিচিতি। আধুনিকতার এই যুগেও এসব বিশ্বাসের টানে এখানে মানুষের সমাগম ঘটে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, কোটা বাড়ির প্রাঙ্গণে থাকা বিশাল বটগাছকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। অনেকের বিশ্বাস, বটগাছের শিকড়ের ফাঁকে নিজের রোগব্যাধি, দুঃখ-কষ্ট কিংবা মনের আকাঙ্ক্ষার কথা লিখে মাদুলিতে ভরে রেখে দিলে সেই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই বিশ্বাস থেকে কেউ কাগজে নিজের মনের কথা লিখে রাখেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায় মানত করেন।
এখানকার আরেকটি প্রচলিত রীতি হলো তেল ও পানি নিয়ে আসা। রোগমুক্তির প্রত্যাশায় অনেকে সঙ্গে করে তেল ও পানি নিয়ে আসেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, কোটা বাড়ির প্রাচীন দুটি পাথরে চুম্বন দিয়ে সেই তেল ও পানি ব্যবহার করেন ভক্তরা। কেউ ওই পানি পান করেন, আবার কেউ তেল বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করেন। তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেন, এখানে এসে মানত করার পর দীর্ঘদিনের রোগব্যাধি কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তবে এসব দাবি লোকবিশ্বাসনির্ভর; এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার কোটা বাড়ি প্রাঙ্গণে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষের আগমন শুরু হয়। কেউ আসেন নিজের অসুস্থতা থেকে মুক্তির আশায়, কেউ পরিবারের সুখ-শান্তির প্রত্যাশায়, আবার কেউ আসেন প্রাচীন স্থাপনাটির ইতিহাস ও প্রচলিত কাহিনি সম্পর্কে জানতে। মানত মেলাকে কেন্দ্র করে স্থানটি হয়ে ওঠে নানা বয়সী মানুষের মিলনস্থল।
শুধু মানত কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, কোটা বাড়িকে ঘিরে রয়েছে গ্রামীণ বাংলার লোকসংস্কৃতির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা গল্প, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান এই স্থাপনাকে স্থানীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। প্রবীণদের কাছ থেকে শোনা নানা কাহিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করে।
ইতিহাসের দিক থেকেও কোটা বাড়ি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য মতে, স্থাপনাটি প্রায় পাঁচ শ বছরের পুরোনো। তবে এর প্রকৃত নির্মাণকাল, প্রতিষ্ঠাতা এবং অতীত ইতিহাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য উদ্ঘাটনে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। প্রাচীন স্থাপত্যের অবশিষ্ট অংশগুলো অতীতের স্মৃতি বহন করলেও সঠিক পরিচর্যার অভাবে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না থাকায় কোটা বাড়ির অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও ভেঙে গেছে পুরোনো দেয়াল, কোথাও সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যাচ্ছে স্থাপনার অবশিষ্ট অংশ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নেওয়া হলে একসময় এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কোটা বাড়ির প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান এবং স্থাপনাটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিরূপণে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রাচীন বটগাছ, স্থাপত্যের অবশিষ্ট অংশ এবং স্থানটিকে ঘিরে প্রচলিত লোককাহিনি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তারা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে কোটা বাড়ির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হলে এটি কলারোয়ার অন্যতম ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া লোকবিশ্বাস, জনশ্রুতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও স্থানটির গুরুত্ব রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগেও মানুষের বিশ্বাস, আশা এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা লোকাচার কীভাবে একটি প্রাচীন স্থাপনাকে ঘিরে টিকে থাকে, কলারোয়ার কোটা বাড়ি তারই এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশ্বাসের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও লোকসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এসব আচার ও জনশ্রুতির সামাজিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোটা বাড়ি আজও মানুষের কাছে রহস্য, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নাম। তবে অযত্নে হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রাচীন স্থাপনাটির ইতিহাস উদ্ঘাটন, যথাযথ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এর ঐতিহ্য তুলে ধরতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।











































