মিলি রহমান।।
অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠেই চা পান করেন। এরপর দিনজুড়ে কয়েক দফায় চলে চা খাওয়া। চা শুধু মনকে সতেজ রাখে না, নিয়মিত ও পরিমিত চা পান হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চা পানকারীদের হৃদ্রোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি চা পান করেন না এমন ব্যক্তিদের তুলনায় ১১ শতাংশ কম।
চা পান স্ট্রোক ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে চায়ের ধরন, তাপমাত্রা এবং পান করার পরিমাণের ওপর এর উপকারিতা নির্ভর করতে পারে।
ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রেও কিছুটা উপকার মিলতে পারে
চীনের ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৯৩৪ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে নয় বছর ধরে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, কুসুম গরম ও মাঝারি গাঢ় কালো চা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। ধূমপান এড়িয়ে চলা ও নিয়মিত ব্যায়ামের মতো স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পাশাপাশি যাঁরা চা পান করেন, তাঁদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল।
তবে ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রেও চা কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ডার্টমাউথ হিচকক মেডিকেল সেন্টারের হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিবিষয়ক কেন্দ্রের ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ জিন কোপল্যান্ড বলেন, ধূমপান না করার ফলে যে পরিমাণ উপকার পাওয়া যায়, ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায় না। তবে চা পান কিছুটা উপকার দিতে পারে। তাঁর মতে, চায়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়।
মাঝারি গাঢ় চায়ে থাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
চা ক্যাটেচিনের ভালো উৎস। এটি একধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব উপাদান রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিছু গবেষণায় স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকির সঙ্গেও চায়ের উপাদানগুলোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পুষ্টিবিদ জিন কোপল্যান্ডের মতে, চা পাতার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পানিতে মিশতে দুই থেকে তিন মিনিট চা ভিজিয়ে রাখাই যথেষ্ট। বেশি সময় চা ভিজিয়ে রাখলে উপকার বাড়বেই, এমন নয়। বরং চায়ের স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে এবং ক্যাটেচিনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
হৃদ্স্বাস্থ্যে কালো চায়ের ভূমিকা
গবেষণায় সবুজ চায়ের তুলনায় কালো চায়ের সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক বেশি ধারাবাহিকভাবে দেখা গেছে। আগের কিছু গবেষণাতেও দেখা গেছে, চিনি ছাড়া কালো বা সবুজ চা কোলেস্টেরল কমাতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
ডেট্রয়েটের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ এবং অ্যাকাডেমি অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকসের মুখপাত্র গ্রেস ডেরোচা বলেন, কালো চায়ে থিয়াফ্লাভিন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি প্রদাহ ও চর্বি বিপাকের প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তার মতে, এ থেকে কালো চা সবুজ চায়ের চেয়ে বেশি উপকারী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। দুই ধরনের চায়েই উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে এবং উভয়ই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
অতিরিক্ত গরম চা হতে পারে ক্ষতিকর
চায়ের ধরন ও গাঢ়ত্বের পাশাপাশি এর তাপমাত্রাও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত গরম চা পান করার সঙ্গে খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। খুব গরম পানীয় খাদ্যনালির আবরণে বারবার তাপজনিত ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষণায় কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার চা পানকারীদের মধ্যে হৃদ্স্বাস্থ্যের কিছু ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে প্রতিদিন ছয় থেকে আট কাপ চা পান করলেই সবার জন্য সমান উপকার হবে, এমনটি নিশ্চিত নয়।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ আনাম ওয়াহিদের মতে, পরিমিত পরিমাণে সাধারণ চা পান উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত গরম চা এড়িয়ে চলা উচিত। বেশি চা পান করলেই যে বেশি উপকার পাওয়া যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
প্রতিদিন কত কাপ চা পান করা যেতে পারে?
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাই তাঁদের চা পানের পরিমাণ জানিয়েছিলেন। তাঁদের ব্যবহৃত কাপের আকারও একরকম ছিল না। ফলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য চায়ের সুনির্দিষ্ট উপকারী পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
পুষ্টিবিদ গ্রেস ডেরোচার মতে, বেশি চা পান করলেই বেশি উপকার পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। আগের কিছু গবেষণায় প্রতিদিন দুই থেকে চার কাপ চা পান করার সঙ্গে ইতিবাচক স্বাস্থ্যগত সম্পর্ক দেখা গেছে।
চায়ে চিনি ও দুধ মেশানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। চিনি যোগ করলে পানীয়টির ক্যালরির পরিমাণ বাড়ে। তাই চিনি ছাড়া চা পান করা ভালো অভ্যাস হতে পারে। স্বাদ বাড়াতে লেবুর রস, পুদিনাপাতা বা দারুচিনি ব্যবহার করা যায়।
সব মিলিয়ে, হৃদ্স্বাস্থ্যের যত্নে পরিমিত চা পান সহায়ক হতে পারে। তবে চা কোনোভাবেই ধূমপান বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। চা পান করতে হলে অতিরিক্ত গরম না করে এবং নিজের ক্যাফেইন সহনশীলতা বিবেচনায় রেখে পান করাই ভালো।











































