দৈনিক খুলনাঞ্চলে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ
খান আরিফুজ্জামান(নয়ন), ডুমুরিয়া প্রতিনিধি||
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের চক্রান্তের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনে ‘দৈনিক খুলনাঞ্চল’। ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক দৈনিক ‘দৈনিক খুলনাঞ্চলে’ অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন। খাতা-কলমে ভূয়া কাজের হিসাব দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা পকেটে পুরার পাঁয়তারা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে। তীব্র সমালোচনার মুখে ও জেলা প্রশাসনের কঠোর নির্দেশে আত্মসাতের অপচেষ্টাকৃত সরকারি কোষাগারের ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন প্রকল্প সভাপতি ও ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার।
দুর্নীতিবাজ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ ডুমুরিয়াবাসী।
যেভাবে ফাঁস হলো অনিয়মের চিত্র: প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিল ডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া এলাকার দীর্ঘদিনের অভিশাপ জলাবদ্ধতা নিরসনে দুটি বড় খাল পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নেয় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। ১. কৃষ্ণনগর নিমতলা হতে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা খাল (৭ কিমি): মোট বরাদ্দ ধরা হয় ১ কোটি ৩০ লাখ ১১ হাজার ৮৪৩ টাকা। ২. সাহস ডোলডাঙ্গা হতে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী খাল (৩.৫ কিমি): মোট বরাদ্দ ধরা হয় ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৮ টাকা।
প্রকল্প নীতিমালায় কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে খালের পানি অপসারণ না করেই ভাসমান ভেক্যু দিয়ে পেড়ি মাটি তুলে পুনরায় খালের পাড়েই ফেলা হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে সেই মাটি ধসে আবারও খাল ভরাট হয়ে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সরেজমিনে কাজের অগ্রগতি অর্ধেকের কম হলেও খাতা-কলমে ৭১ ভাগ থেকে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে ভুয়া অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দেন ইউএনও সবিতা সরকার।
‘দৈনিক খুলনাঞ্চল’-এর সংবাদ ও প্রশাসনিক তোলপাড়: শ্রমিকদের কাজ না দিয়ে বরাদ্দকৃত মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের এই পাঁয়তারা এবং ডুমুরিয়াবাসীকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার মুখে ঠেলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রমাণসহ ‘দৈনিক খুলনাঞ্চলে’ বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটি প্রকাশ হওয়ামাত্রই সুধী মহল ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। সংবাদের সত্যতা পেয়ে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন এবং ডুমুরিয়া ইউএনওকে দুই দফা টেলিফোনে তীব্র ভর্ৎসনা ও কড়া নির্দেশনা প্রদান করেন। একই সাথে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মিনাক্ষী ব্রহ্ম সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এসে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পানি নিষ্কাশন না করে ভেক্যু দিয়ে মাটি কাটার জালিয়াতি বন্ধের নির্দেশ দেন।
টাকা ফেরতের নির্দেশ ও অপচেষ্টা: সংবাদ প্রকাশের পর কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলে দুর্নীতি ঢাকতে বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে জেলা প্রশাসকের দপ্তরে চিঠি পাঠান ইউএনও সবিতা সরকার। তবে জেলা প্রশাসন কোনো অজুহাত বরদাশত না করে গত ১৩ আগস্ট লিখিত পত্রের মাধ্যমে ভূয়া কাজের নামে অব্যায়িত ও আত্মসাতের চেষ্টা করা টাকা অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেয়। প্রশাসনিক চাপে বাধ্য হয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন মোট ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে ফেরত প্রদান করে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ত্রাণ কর্মকর্তার বক্তব্য: ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন টাকা ফেরতের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া দুটি খালের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে খুলনা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম জানান, সরেজমিনে কাজের প্রকৃত পরিমাণ মূল্যায়ন করেই জেলা প্রশাসকের আদেশে অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা হয়েছে। এদিকে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন, তবে মিটিংয়ের অজুহাতে এর বেশি কথা বলতে রাজি হননি।
জনমনে স্বস্তি ও ইউএনওর শাস্তির দাবি: ‘দৈনিক খুলনাঞ্চলে’ সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত না হলে জনগণের বিপুল অঙ্কের সরকারি টাকা লোপাট হয়ে যেত বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ভুয়া প্রতিবেদন দাখিল এবং প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প নিয়ে নয়ছয় করায় প্রকল্প সভাপতি ও ইউএনও সবিতা সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তপূর্বক দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ।










































